বিশেষ: দেশভাগের সময় একটি হাতি নিয়ে হয়েছিল ভারত-পাক দ্বন্দ্ব, জেনেনিন সেই ঐতিহাসিক কাহিনী

১৯৪৭ সালের ১৪-১৫ আগস্টের মধ্যরাতের স্বাধীনতা শুধু আনন্দের ছিল না, ছিল এক বেদনাদায়ক দেশভাগের ট্র্যাজেডি। এই বিভাজনের ফলে প্রায় ১ কোটি ৪০ লক্ষ মানুষকে তাদের ঘরবাড়ি ছাড়তে হয় এবং লাখ লাখ মানুষ সাম্প্রদায়িক হিংসার শিকার হন। এই দেশভাগের সময় শুধু মানচিত্র নয়, দেশের সমস্ত সম্পদও ভাগ করা হয়েছিল। সেনাবাহিনী, অর্থ, সরকারি অফিস থেকে শুরু করে লাইট বাল্ব—সবকিছুতেই ছিল বিভাজনের চিহ্ন।

পার্টিশন কাউন্সিল এবং সম্পদের বিভাজন:
১৯৪৭ সালের ৩ জুন দেশভাগের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ার পর ব্রিটিশ ভারতের সম্পদ কীভাবে দুই দেশের মধ্যে ভাগ করা হবে, তা নিয়ে এক জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়। এই সমস্যার সমাধানের জন্য লর্ড মাউন্টব্যাটেনের নেতৃত্বে ১৬ জুন গঠিত হয় ‘পার্টিশন কাউন্সিল’। এই কাউন্সিলে কংগ্রেসের পক্ষে ছিলেন সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল এবং রাজেন্দ্র প্রসাদ, এবং মুসলিম লিগের পক্ষে ছিলেন লিয়াকত আলি খান ও মুহাম্মদ আলি জিন্নাহ। মাত্র ৭০ দিনের মধ্যে এই কাউন্সিলকে সমস্ত সম্পদ ভাগ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।

সেনা ও অর্থের বিভাজন:
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সেনাবাহিনীর বিভাজন। সিদ্ধান্ত হয় যে, সেনাবাহিনীর দুই-তৃতীয়াংশ ভারত পাবে এবং এক-তৃতীয়াংশ যাবে পাকিস্তানের ভাগে। রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রায় ২,৬০,০০০ সৈন্য ভারতে থাকেন, যাদের বেশিরভাগ হিন্দু ও শিখ। অন্যদিকে, প্রায় ১,৪০,০০০ মুসলিম সৈন্য পাকিস্তানে চলে যান। আর্থিক সম্পদের ক্ষেত্রে, দেশভাগ চুক্তি অনুসারে ব্রিটিশ ভারতের মোট সম্পদের ১৭.৫ শতাংশ পায় পাকিস্তান এবং ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত পাকিস্তানকে ২০ কোটি টাকা দেয়।

ছোট ছোট জিনিসও ভাগ হয়েছিল:
আর্থিক ও সামরিক সম্পদ ছাড়াও অন্যান্য অস্থাবর সম্পদও ভাগ করা হয়। সমস্ত অস্থায়ী সম্পদ ৮০:২০ অনুপাতে ভাগ করা হয়েছিল। এর মধ্যে অফিসের আসবাবপত্র, স্টেশনারি জিনিস এবং এমনকি লাইট বাল্বও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

‘জয়মণি’ নামের হাতির গল্প:
দেশভাগের বিভাজনে ‘জয়মণি’ নামের একটি হাতিরও নাম উঠে এসেছিল, যা ছিল ব্রিটিশ বন দপ্তরের একটি হাতি। এই হাতিকে কোন দেশ পাবে, তা নিয়েও বিতর্ক শুরু হয়েছিল। পার্টিশন কাউন্সিল সিদ্ধান্ত নেয় যে জয়মণিকে পূর্ব পাকিস্তান দেওয়া হবে। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় যখন জয়মণির মাহুত পূর্ব পাকিস্তানে যেতে রাজি হননি। তার আশঙ্কা ছিল, একবার গেলে তাকে আর ফিরে আসতে দেওয়া হবে না। এই কারণে জয়মণিকে নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া দীর্ঘ ১০ মাস ধরে আটকে ছিল।

১৯৪৮ সালের জুনে পূর্ব পাকিস্তানের বন দপ্তরের দুই কর্মী যখন জয়মণিকে নিতে মালদায় আসেন, তখন মালদার তৎকালীন ডিস্ট্রিক্ট কালেক্টর তাদের জানান যে, গত ১০ মাস ধরে জয়মণির দেখভালের খরচ বাবদ ১৯০০ টাকা দিতে হবে। টাকা না থাকায় ওই দুই কর্মীকে জেলে পাঠানো হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, শেষ পর্যন্ত জয়মণিকে আর পূর্ব পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি এবং সে মালদাতেই থেকে গিয়েছিল।

এই ঘটনাগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, দেশভাগের বেদনা শুধু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তা দেশের প্রতিটি ছোট-বড় সম্পদকেও স্পর্শ করেছিল।