লালকেল্লায় প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ, নতুন মিশনে পুরনো রাজনীতি?

প্রতি বছরের মতো এবারও স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লা থেকে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এই বছর তার ভাষণে একটি নতুন ‘ডেমোগ্রাফি মিশন’ গঠনের ঘোষণা করেছেন, যার লক্ষ্য দেশজুড়ে অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। প্রধানমন্ত্রী বলেন, “পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে দেশের জনসংখ্যার বিন্যাস বদলানোর চেষ্টা চলছে।” তার এই মন্তব্য বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী এবং শমীক ভট্টাচার্যকে উৎসাহিত করেছে।
বহু পুরনো ইস্যু
অনেকের মনে প্রশ্ন উঠেছে, অনুপ্রবেশের মতো একটি সমস্যা মোকাবিলায় কেন সরকার ১১ বছর সময় নিলো? ২০০৩ সালে সাংবাদিকতা শুরু করা এক সাংবাদিক তার অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী লালকৃষ্ণ আদভানি এই বিষয়টি নিয়ে বহুবার সরব হয়েছিলেন। মনমোহন সিংয়ের আমলে তিনি বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ নিয়ে কংগ্রেসের নরমপন্থার সমালোচনাও করতেন। প্রশ্ন হলো, অনুপ্রবেশ যদি এত বড় সমস্যাই হয়, তাহলে মোদী সরকার ২০১৪ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকার পরেও এই বিষয়ে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মিশন গঠন করতে কেন এত দেরি করলো? পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি আসলে পুরোনো ‘পেপার ব্যাকের’ নতুন ‘হার্ড কভার’ ছাড়া আর কিছুই নয়।
ফাঁপা প্রতিশ্রুতি ও রাজনৈতিক কৌশল
২০১৪ সালে ‘আচ্ছে দিন’, কালো টাকা ফিরিয়ে আনা এবং প্রত্যেক নাগরিকের অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা দেওয়ার মতো প্রতিশ্রুতিগুলো এখনও অনেকের মনে আছে। একইভাবে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’, ‘জনধন যোজনা’ এবং ‘স্বচ্ছ ভারত’-এর মতো প্রকল্পগুলোও এখন ফিকে হয়ে এসেছে। কোভিড-১৯ মহামারীর সময় থালা বাজানোর পর সেই শব্দ কতদূর পৌঁছাল, তা নিয়েও কেউ আর খোঁজ রাখে না। সমালোচকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর এবারের বক্তৃতা ২০১৪ সালের আত্মবিশ্বাসী নেতার একটি ছায়ামাত্র। এতে নতুন কোনও দৃষ্টিভঙ্গি বা সৃজনশীল নীতির প্রস্তাব ছিল না।
প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে সংবিধান, ঐক্য এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কথা বললেও, তার সরকারের কার্যক্রম সেগুলোর বিপরীত বলেই অনেকে মনে করেন। তিনি বলেছেন যে নাগরিকদের অযথা জেলে পাঠানো হয় এমন আইন বাতিল করা হবে, অথচ তার শাসনকালে বিরোধী নেতা, সাংবাদিক এবং সমাজকর্মীদের বিরুদ্ধে এসব আইনের অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। ঐক্য ও সংহতির কথা বললেও ভোটের প্রচারে বিভাজনমূলক মন্তব্য করা হয়েছে বলেও অনেকে অভিযোগ করেন।
বাস্তবতা ও অর্থনীতির চিত্র
প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের সঙ্গে বাস্তব অর্থনৈতিক চিত্র অনেক ক্ষেত্রেই মেলে না। তিনি সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের উন্নতির জন্য ৫০ বছর ফাইল আটকে থাকার কথা বলেছেন, যদিও ভারতে সেমিকন্ডাক্টর কমপ্লেক্স ১৯৮৩ সালেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। একইভাবে, তিনি মহিলাদের স্বনির্ভরতার প্রসঙ্গে এমনভাবে বলেছেন যেন এই আন্দোলন তার হাত ধরেই শুরু হয়েছে, যদিও ভারতের কো-অপারেটিভ আন্দোলন এবং মহিলা গোষ্ঠীর আর্থিক ক্ষমতায়নের ইতিহাস অনেক পুরোনো।
‘লোকাল ফর ভোকাল’ স্লোগানের মাধ্যমে তিনি আত্মনির্ভর ভারতের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন, কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৪ সালে চীনের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৩৭ বিলিয়ন ডলার, যা ১০ বছর পর ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের মূল সমস্যা বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, আয় বৈষম্য এবং দুর্বল শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিকাঠামো, যা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতায় স্পষ্ট কোনো দিশা ছিল না।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তৃতায় বিরোধীদের সমালোচনা না করার কথা বললেও, তিনি কংগ্রেস আমলের সিন্ধু নদীর জল চুক্তির মাধ্যমে পাকিস্তানকে সাহায্য করার অভিযোগ তুলেছেন। তিনি ইন্দিরা গান্ধীর সবুজ বিপ্লব বা জওহরলাল নেহরুর বিজ্ঞান ও মহাকাশ ক্ষেত্রে অবদানের কথা একবারও উল্লেখ করেননি। সব মিলিয়ে, সমালোচকদের মতে, এবারের স্বাধীনতা দিবসের ভাষণ দেশের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বদলে রাজনৈতিক কৌশল এবং পুরোনো প্রতিশ্রুতির পুনরাবৃত্তি নিয়েই সীমাবদ্ধ ছিল।