“বিয়ে রুখতে বুদ্ধি করেই অডিয়ো রেকর্ড” ‘কন্যাশ্রী’-র মঞ্চে লড়াইয়ের শিক্ষা দিল মেদিনীপুরের কন্যা

এক অদম্য জেদ আর একটি অডিয়ো রেকর্ডিং। এই দুইয়ের ওপর ভর করে বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে লড়াই করে নিজের জীবন বাঁচাল পশ্চিম মেদিনীপুরের কেশপুরের এক কিশোরী। স্কুল শিক্ষকের যৌন হেনস্তার শিকার হয়ে বছর দুয়েক আগে কঠিন সময় পার করলেও, পড়াশোনা ছাড়েনি সে। এবার তার পরিবারই যখন অভাব আর লোকলজ্জার ভয়ে বিয়ের ব্যবস্থা করে, তখনো হার মানেনি সে। বৃহস্পতিবার কন্যাশ্রী দিবসের অনুষ্ঠানে এই ‘বীরাঙ্গনা’কে সংবর্ধনা দিয়েছে জেলা প্রশাসন।
অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী থাকাকালীন এক শিক্ষকের যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর প্রায় এক বছর সরকারি হোমে কাটাতে হয় ওই কিশোরীকে। তবে পড়া ছাড়েনি সে। দশম শ্রেণিতে নতুন করে ভর্তি হয়ে জীবনটা গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল। কিন্তু অভাব এবং লোকলজ্জার ভয়ে তার পরিবার ১৩ আগস্ট তার বিয়ে ঠিক করে ফেলে।
পরিবারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেও কোনো ফল হয়নি। মোবাইল কেড়ে নেওয়া হয়েছিল তার কাছ থেকে। কিন্তু বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সে গোপনে একটি অডিয়ো রেকর্ড করে এক পরিচিতের কাছে পাঠিয়ে দেয়। সেই পরিচিত ব্যক্তি অডিয়ো বার্তাটি জেলা পরিষদের শিশু, নারী ও জনকল্যাণ বিষয়ক কর্মাধ্যক্ষ শান্তি টুডুর কাছে পৌঁছে দেন। এরপর পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে শান্তি টুডু ওই কিশোরীর বাড়ি গিয়ে বিয়ে বন্ধ করেন।
এই সাহসিকতার স্বীকৃতিস্বরূপ ১৪ আগস্ট কন্যাশ্রী দিবসের অনুষ্ঠানে মেয়েটিকে ‘কন্যাশ্রী’ পুরস্কার দিয়ে সংবর্ধনা জানানো হয়। মেদিনীপুর শহরের প্রদ্যোৎ স্মৃতি সদনে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জেলাশাসক খুরশিদ আলি কাদেরি, জেলা পরিষদের সভাধিপতি প্রতিভা মাইতি-সহ বহু গণ্যমান্য ব্যক্তি।
শান্তি টুডু বলেন, “পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো না থাকায় হয়তো তাঁরা মেয়েকে শ্বশুরবাড়ি পাঠানোই ভালো মনে করেছিলেন। কিন্তু এই মেয়ের ভেতরের লড়াইয়ের জেদকে কোনোভাবেই থামানো সম্ভব নয়।” মেয়েটির বাবা-মায়ের কাছ থেকে মুচলেকাও নেওয়া হয়েছে যাতে তারা নাবালিকা মেয়ের বিয়ে না দেন। আগামী বছর মাধ্যমিক দেবে এই সাহসী মেয়েটি। জেলাশাসক খুরশিদ আলি কাদেরি তাকে উৎসাহ দিয়ে বলেন, “এগিয়ে যাও, আমরা তোমার পাশে আছি।”
একদিকে পুরনো ক্ষত, অন্যদিকে পরিবারের চাপ—এই দুইয়ের সঙ্গে লড়ে যে কিশোরী নিজের জীবনকে রক্ষা করল, তার এই লড়াইয়ের কাহিনি সকলের কাছে এক অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।