চলছে ভারত-মার্কিন বাণিজ্য সংঘাত! রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করলে বিশ্ব অর্থনীতিতে কী প্রভাব পরবে?

গত তিন বছরে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলস্বরূপ বিশ্বব্যাপী তেল বাণিজ্যের মানচিত্র সম্পূর্ণ বদলে গেছে। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে ভারত, যে দেশটি আগে রাশিয়া থেকে প্রায় কোনও তেল কিনত না, এখন তারাই মস্কোর সবচেয়ে বড় তেল ক্রেতা। কিন্তু সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতের ওপর শুল্ক দ্বিগুণ করে ৫০ শতাংশ করায় এই নীতি নতুন সংকটের মুখে পড়েছে। এর কারণ হিসেবে ট্রাম্প প্রশাসন সরাসরি ভারতের রাশিয়া থেকে তেল কেনার বিষয়টিকে দায়ী করেছে।
যদি মার্কিন চাপের মুখে পড়ে ভারত রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করে, তাহলে এর প্রভাব কেবল ভারতের অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বিশ্বজুড়ে জ্বালানির বাজার, বাণিজ্য ও মূল্যস্ফীতির ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে।
ভারতের উপর চাপ ও সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব
রাশিয়ার তেলের উপর নির্ভরতা: ইউক্রেন যুদ্ধের আগে ভারত তার মোট আমদানিকৃত তেলের ২ শতাংশেরও কম রাশিয়া থেকে কিনত। কিন্তু এখন তা বেড়ে ৩৫-৪০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। জুন মাসে রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানি ছিল দৈনিক ২.০৮ মিলিয়ন ব্যারেল, যা মোট আমদানির ৪৪ শতাংশ।
অর্থনৈতিক সুবিধা: সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার (CREA) এর তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া থেকে সস্তায় তেল কেনার ফলে ভারত ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রায় ৩৩ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করেছে।
আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি: স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া (এসবিআই) অনুমান করছে, ভারত যদি রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করে দেয়, তাহলে আগামী দুই অর্থ বছরে জ্বালানি আমদানির খরচ ৯.১ বিলিয়ন থেকে ১১.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে।
মুদ্রাস্ফীতি এবং রুপির উপর চাপ: অতিরিক্ত আমদানির খরচ বৃদ্ধির কারণে দেশে মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে এবং টাকার মূল্যের ওপর চাপ সৃষ্টি হবে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব
ভারত যদি হঠাৎ করে রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করে দেয়, তাহলে এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে:
তেলের দাম বৃদ্ধি: রাশিয়া প্রতিদিন প্রায় ৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল রপ্তানি করে। যদি ভারত এই বিশাল পরিমাণ তেল কেনা বন্ধ করে দেয়, তাহলে বিশ্ব বাজারে তেলের সরবরাহ হ্রাস পাবে। ফলে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি প্রায় ৬৬ ডলার থেকে ১১০-১২০ ডলারে পৌঁছে যেতে পারে, যা বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতিকে বাড়িয়ে দেবে।
সাপ্লাই চেইন বিঘ্নিত: ভারতের শোধনাগারগুলি রাশিয়ান তেল শোধনের জন্য বিশেষভাবে তৈরি। তাই হঠাৎ করে সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে মধ্যপ্রাচ্য বা অন্য অঞ্চল থেকে একই মানের তেল কেনা কঠিন হবে। এর ফলে দাম বৃদ্ধি পাবে এবং তেল পরিবহনেও সময় বেশি লাগবে।
রপ্তানিতে প্রভাব: ভারত শুধুমাত্র তেল আমদানিই করে না, বরং পরিশোধিত জ্বালানি যেমন পেট্রোল, ডিজেল এবং বিমান জ্বালানিও ইউরোপ ও আফ্রিকাতে রপ্তানি করে। যদি ভারত রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানি বন্ধ করে দেয়, তাহলে পরিশোধিত জ্বালানির রপ্তানি কমে যাবে, যা বিশ্বব্যাপী জ্বালানির ঘাটতি তৈরি করতে পারে।
চীনের ভূমিকা: রাশিয়াকে নতুন গ্রাহক খুঁজতে হবে এবং চীন আরও বেশি তেল কিনতে পারে। কিন্তু আমেরিকার সঙ্গে চীনের বড় বাণিজ্য সম্পর্ক থাকায় চীনের ওপর দ্বিতীয় দফা নিষেধাজ্ঞা আরোপের সম্ভাবনা কম। তবে, এর ফলে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে নতুন করে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হবে।
সব মিলিয়ে, ভারত যদি রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করে দেয়, তবে তা শুধু ভারতের অর্থনীতি নয়, বরং বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম এবং বাণিজ্যের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করবে