ডাক্তারের রায় ভুল প্রমাণ করে জীবনের মূলস্রোতে ঐশানী, মায়ের লড়াইয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন

“ও কিছু পারবে না, ওকে শোকেসে সাজিয়ে রাখুন।”– জন্ম থেকেই শ্রবণ ও বাকশক্তিহীন (Profound Deaf) ঐশানী সরকারকে নিয়ে এক সময় এমন কথাই বলেছিলেন চেন্নাইয়ের এক নামী চিকিৎসক। কিন্তু সেই মন্তব্যকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলেন তার মা পায়েল সরকার। আর আজ, সেই মেয়ের অসাধারণ শিল্পকর্মেই সেজে উঠেছে শোকেস। আসানসোলের গোপালপুরের বাসিন্দা ঐশানী সরকার, আজ আর দশটা সাধারণ মেয়ের মতোই জীবনের পথে এগিয়ে চলেছে।
অদম্য লড়াইয়ের শুরু
২০০৪ সালে জন্ম নেওয়া ঐশানীর যখন এক বছর আট মাস বয়স, তখনই তার মা বুঝতে পারেন যে মেয়ের শ্রবণশক্তি নেই। একাধিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকরা জানান, ঐশানীর ১১০ ডিবি হিয়ারিং লস আছে, যার অর্থ সে কোনো শ্রবণযন্ত্রের সাহায্য নিয়েও কিছু শুনতে পাবে না। এমনকি, সে কথাও বলতে পারবে না। এই কঠিন বাস্তব মেনে না নিয়ে ঐশানীর মা পায়েল সরকার মেয়ের জন্য লড়াই শুরু করেন।
দুর্গাপুরের একটি বিশেষ থেরাপি সেন্টার ‘সাহস’-এর সন্ধান পাওয়ার পর তিনি জানতে পারেন যে, বাবা-মায়ের অক্লান্ত পরিশ্রমই পারে ঐশানীকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে। এরপর তিনি নিজে স্পেশাল এডুকেশনের ওপর পড়াশোনা করেন এবং মেয়েকে প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন। চার মাসের কঠিন সাধনার পর ঐশানী প্রথম শব্দ উচ্চারণ করে—’মা’।
মা নিজেই হলেন প্রশিক্ষক
ঐশানীকে প্রতিটি শব্দ, যেমন রান্নার শব্দ, বৃষ্টির শব্দ, এমনকি কাক ডাকার শব্দও আলাদাভাবে চেনাতে হয়েছে। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় পায়েল সরকার নিজে একজন স্পেশাল এডুকেটর ও থেরাপিস্ট হয়ে ওঠেন এবং বর্তমানে তিনি আসানসোলের একটি বিশেষ স্কুল ‘আনন্দম’-এর প্রিন্সিপাল। নিজের মেয়ের জন্য শুরু করা এই লড়াই আজ আরও অনেক বিশেষ শিশুকে আলোর পথ দেখাচ্ছে।
শিল্পের আঙিনায় ঐশানীর সাফল্য
শৈশব থেকেই ছবি আঁকার প্রতি বিশেষ ঝোঁক ছিল ঐশানীর। এই প্রতিভা দেখে তার মা তাকে আসানসোলের বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী শুভজিৎ গড়াইয়ের কাছে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। শুভজিৎ বাবুর তত্ত্বাবধানে ঐশানী বর্ধমান আর্ট কলেজে সুযোগ পায় এবং ভিজ্যুয়াল আর্টস নিয়ে পড়াশোনা শুরু করে। এখন সে ফাইনাল ইয়ারের ছাত্রী।
ঐশানীর শিল্পকর্মে ছবি আঁকা, আলপনা, ক্লে আর্ট, টেক্সটাইল ডিজাইন, বাটিক প্রিন্ট এবং কাগজের কোলাজ-এর মতো বিভিন্ন কাজ দেখা যায়, যা বহু প্রশংসা কুড়িয়েছে। তার অসাধারণ প্রতিভার জন্য সে রাজ্য সরকারের নারী ও শিশু বিকাশ ও সমাজ কল্যাণ দফতর থেকে ‘প্রতিবন্ধকতাযুক্ত সৃজনশীল শিশু’ হিসেবে পুরস্কৃত হয়েছে।
ঐশানীর বাবা বাসব সরকার বলেন, “আমি চাই ও নিজের পায়ে দাঁড়াক এবং সমাজে এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করুক।” আর ঐশানীর প্রশিক্ষক শুভজিৎ গড়াইয়ের কথায়, “ঐশানী মানুষ হিসেবে এত ভালো যে ওর ছবিটাও সুন্দর হয়ে যায়। ও আগামী দিনে আরও এগিয়ে যাক, এটাই আমার প্রার্থনা।” ঐশানীর স্বপ্ন হলো নিজের ডিজাইনিং হাউস তৈরি করে ব্যবসা করা এবং তার মতো বিশেষ শিশুদের ছবি আঁকা শেখানো।
ঐশানী ও তার মায়ের এই অদম্য লড়াই হাজার হাজার মানুষকে অনুপ্রেরণা যোগাচ্ছে। তাঁদের এই অসাধ্য সাধন প্রমাণ করে যে, ভালোবাসা, ধৈর্য এবং কঠোর পরিশ্রম দিয়ে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়।