“কেউ কম টাকা পেয়েছেন..”-কৃষিতে ক্ষতির টাকা অন্যের অ্যাকাউন্টে, শোরগোল বাংলায়

চলতি বছরের মার্চ মাসে শিলাবৃষ্টিতে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার কৃষকরা অবশেষে ক্ষতিপূরণের টাকা পেলেও, সেই আনন্দ বিষাদে পরিণত হয়েছে। টাকা অ্যাকাউন্টে ঢোকা মাত্রই দেখা দিয়েছে চরম বিশৃঙ্খলা – কোথাও বাদাম চাষের ক্ষতির টাকা ঢুকেছে ধান চাষির অ্যাকাউন্টে, আবার কোথাও ক্ষতিপূরণের টাকা চলে গেছে সম্পূর্ণ অন্য ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে! এই ঘটনায় দাঁতন-২ ব্লকের জেনকাপুর গ্রাম পঞ্চায়েত রীতিমতো তোলপাড়।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অভিযোগ, কেউ পেয়েছেন প্রত্যাশার চেয়ে কম টাকা, আবার কেউ পেয়েছেন বেশি টাকা। বৃহস্পতিবার (৩১শে জুলাই, ২০২৫) এই অনিয়মের প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ চাষিরা কৃষি দফতরে গিয়ে বিক্ষোভ দেখান। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পরে পুলিশ, বীমা সংস্থা এবং কৃষি দফতরের আধিকারিকরা ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের সাথে আলোচনার সিদ্ধান্ত নেন। একই সাথে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে, পঞ্চায়েত অফিসে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা পুনরায় খতিয়ে দেখে ভুল সংশোধন করে সঠিক টাকা ছাড়া হবে।
চলতি বছরের মার্চ মাসে যে ভয়াবহ শিলাবৃষ্টি হয়েছিল, তাতে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার ৬টি ব্লকের ১৮টি গ্রাম পঞ্চায়েতের কৃষি ক্ষেত্রে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। সম্প্রতি, ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বীমা সংস্থা প্রায় ১৩৬ কোটি টাকা মঞ্জুর করেছে, এবং সেই টাকা এখন চাষিদের অ্যাকাউন্টে পাঠানোর কাজ শুরু হয়েছে।
জেনকাপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের ২০টি মৌজার ৫৯৬৩ জন চাষি এই শিলাবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন। তাঁদের জন্য ১৬ কোটি ৩৮ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ বরাদ্দ হয়েছিল। কিন্তু টাকা পাওয়ার প্রক্রিয়ায় চরম অব্যবস্থা দেখা দিয়েছে। অনেক চাষির অ্যাকাউন্টে টাকা ঢোকেনি, আবার যাদের ঢুকেছে, তাদের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে ব্যাপক ভুল। যেমন, কৃষক অজিতকুমার দে জানান, “আমার ধানের ক্ষতি হয়েছিল। কিন্তু দেখছি বাদামের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। ফলে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ মেলেনি। দ্রুত নির্দিষ্ট ক্ষতিপূরণের টাকা চাই।”
অশোককুমার ভুঁইয়া নামে আরেক কৃষক অভিযোগ করেন, “আমি যে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নম্বর দিয়েছিলাম সেটি ব্যবহার করা হয়নি। ক্ষতিপূরণের তালিকায় দেখছি অন্য কারও অ্যাকাউন্ট নম্বর।” প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, এই ধরনের অসংখ্য সমস্যা দেখা দিয়েছে। কারো ৫ বিঘা জমির ধান চাষে ক্ষতি হলেও তিনি পেয়েছেন মাত্র ২ বিঘার ক্ষতিপূরণ। আবার কারো ৩ বিঘা জমির বাদাম চাষের ক্ষতি হলেও তিনি পেয়েছেন ৪ বিঘার ক্ষতিপূরণ, অর্থাৎ বেশি টাকা।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলির মধ্যে একটি হলো, যেখানে কোনো ক্ষতি হয়নি, সেই পাশের মৌজার চাষির নামও ক্ষতিপূরণের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। এমনকি, ২০-৩০ জন ক্ষতিগ্রস্ত চাষির জন্য একটি মাত্র ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নম্বর দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
দাঁতনের বিধায়ক বিক্রমচন্দ্র প্রধান এই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা ঘটনাটি জানার পরেই বীমা সংস্থাকে ভুল শুধরে নেওয়ার কথা জানিয়ে দিয়েছি। প্রশাসন ক্ষতিগ্রস্তদের সঠিক তালিকা ও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নম্বর দিয়েছিল। তা মাঝপথে হঠাৎ পরিবর্তন হলো কী করে?” এই প্রশ্নই এখন রাজনৈতিক মহলে ঘুরপাক খাচ্ছে – সত্যিই কি তালিকার কোনো পরিবর্তন হয়েছে, নাকি প্রশাসনের গাফিলতিই এই চরম অব্যবস্থার জন্য দায়ী? দ্রুত এই সমস্যা নিরসন করে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সঠিক ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে সব মহল থেকে।