আর জি কর ঘটনায় উত্তাল রাজ্য রাজনীতি, সৌমিত্র খানের বিস্ফোরক অভিযোগ

কলকাতার আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে এক মহিলা চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র উত্তাপ ছড়িয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শাসক তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণ শানিয়েছেন বিজেপি সাংসদ তথা বিষ্ণুপুরের প্রতিনিধি সৌমিত্র খাঁ। তিনি রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার বেহাল দশা এবং নারী সুরক্ষায় সরকারের ব্যর্থতাকে দায়ী করেছেন।
সৌমিত্র খাঁ-এর তীব্র আক্রমণ: ‘বাংলায় গণতন্ত্র নেই’
বুধবার এক সাংবাদিক সম্মেলনে সৌমিত্র খাঁ বলেন, “আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে একজন মহিলা চিকিৎসককে ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়েছে। প্রতিদিন বাংলায় তৃণমূল বাদে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের কর্মীদের উপর অত্যাচার চলছে।” তিনি অভিযোগ করেন, রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার এই বেহাল দশা সত্ত্বেও তৃণমূল নেতারা দেশের গণতন্ত্র নিয়ে মন্তব্য করেন, যা হাস্যকর। সৌমিত্র খাঁ আরও দাবি করেন, “আমাদের ২৫০ জন দলীয় কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। তাদের প্রথমে বাংলার কথা ভাবা উচিত, তারপর দেশের কথা ভাবা উচিত।” তিনি তৃণমূল সরকারকে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার দিকে নজর দিতে পরামর্শ দেন।
আর জি কর ঘটনা: CBI তদন্তে ক্ষোভ
২০২৪ সালের ৯ আগস্ট আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে ৩১ বছর বয়সী এক পোস্টগ্র্যাজুয়েট ট্রেইনি চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা ঘটে, যা দেশজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল। ঘটনার পর কলকাতা পুলিশের সিভিক ভলান্টিয়ার সঞ্জয় রায়কে গ্রেফতার করা হলেও, কলকাতা পুলিশের তদন্তে অনাস্থা প্রকাশ করে কলকাতা হাইকোর্ট মামলাটি কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা (CBI)-এর হাতে তুলে দেয়। এই সিদ্ধান্ত তৃণমূল সরকারের জন্য এক বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হয়।
সৌমিত্র খাঁ এই ঘটনায় তৃণমূল সরকারের উপর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এই ধরনের জঘন্য অপরাধ রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার ব্যর্থতার প্রমাণ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন সরকার নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে।”
রাজনৈতিক হিংসা ও প্রমাণ লোপাটের অভিযোগ
সৌমিত্র খাঁ আরও অভিযোগ করেছেন যে, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস বিরোধী দলের কর্মীদের উপর নিয়মিত অত্যাচার চালাচ্ছে। তিনি দাবি করেন, বিজেপির ২৫০ জন কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে এবং এই হিংসার জন্য সরাসরি তৃণমূল সরকারই দায়ী। তাঁর মতে, “তৃণমূলের গুন্ডারা বিরোধী দলের কর্মীদের উপর হামলা চালাচ্ছে, তাদের ভয় দেখাচ্ছে। এটা কোনো গণতন্ত্র নয়।” আর জি কর হাসপাতালে যে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে, তা তৃণমূলের ‘গুন্ডা’দের দ্বারা সংঘটিত হয়েছে এবং এর উদ্দেশ্য প্রমাণ নষ্ট করা, এমন অভিযোগও তুলেছেন বিজেপি নেতারা।
আর জি কর ঘটনার প্রতিবাদে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি ইউনিট মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদত্যাগের দাবিতে রাজ্যজুড়ে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছে। বিজেপির রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার এবং শুভেন্দু অধিকারী, লকেট চট্টোপাধ্যায়ের মতো নেতারা সক্রিয়ভাবে এই প্রতিবাদে অংশ নিচ্ছেন। সৌমিত্র খাঁও এই দাবির সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলেন, “তৃণমূল সরকারের অধীনে বাংলায় নারী ও চিকিৎসকদের নিরাপত্তা বিপন্ন। এই সরকারের কোনো নৈতিক অধিকার নেই ক্ষমতায় থাকার।” তিনি কলকাতা পুলিশ কমিশনার বিনীত গোয়েলের পদত্যাগেরও দাবি জানান।
তৃণমূলের পাল্টা জবাব ও ‘অপরাজিতা’ বিল
তৃণমূল কংগ্রেস অবশ্য এই অভিযোগগুলোকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। তৃণমূলের মতে, “বিজেপি এবং বামপন্থীরা এই ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করছে। তদন্ত সিবিআই-এর হাতে রয়েছে এবং সুপ্রিম কোর্ট এটি তদারক করছে।” তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র বলেন, “আমাদের দলের বিরুদ্ধে প্রমাণ নষ্ট করার অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।” তৃণমূল সরকার তাদের প্রতিশ্রুতির প্রমাণ হিসেবে ৩ সেপ্টেম্বর ‘অপরাজিতা মহিলা ও শিশু বিল’ পাশের কথা তুলে ধরেছে, যেখানে ধর্ষণ এবং শিশুদের উপর যৌন নির্যাতনের মতো অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
আর জি কর ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিবাদের সৃষ্টি করেছে। জুনিয়র ডাক্তাররা ৪২ দিন ধরে ধর্মঘট করেছেন এবং হাসপাতালে নিরাপত্তার দাবিতে ‘রিক্লেইম দ্য নাইট’ প্রতিবাদে হাজার হাজার মহিলা বাংলার রাস্তায় নেমেছেন। সৌমিত্র খাঁ-এর বক্তব্য তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে বিজেপির তীব্র সমালোচনার অংশ এবং এটি রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।