গানের সুরে শিক্ষাদান, নারায়ণগড় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ভাস্কর বসুর অন্যরকম পাঠশালা

পেশা শিক্ষকতা হলেও সংগীতই তাঁর প্রাণ। ছোটবেলায় মায়ের কাছে গানের যে পাঠ শুরু হয়েছিল, সেই সুর আজও তাঁর গলায় অক্ষুণ্ণ। আর এই সুরের জাদুতেই তিনি জয় করেছেন পশ্চিম মেদিনীপুরের নারায়ণগড় রাজ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের খুদে পড়ুয়াদের মন। তিনি সহকারী শিক্ষক ভাস্কর বসু, যিনি ক্লাসে পড়ানোর সঙ্গেই গান করেন, গানের সুরেই পড়া বোঝান এবং অবসর সময়েও তাঁর কণ্ঠে লেগে থাকে মধুর গুনগুনানি।
প্রত্যন্ত গ্রামের এই বিদ্যালয়ে ভাস্কর বসু স্যার যেন এক অন্যরকম অনুপ্রেরণা। বয়সের ভারে হয়তো স্বরের তারতম্য এসেছে, কিন্তু তাঁর গানের মাধুর্যে বিন্দুমাত্র ঘাটতি পড়েনি। ছাত্রছাত্রীদের কাছে তিনি কেবল একজন শিক্ষক নন, একজন প্রিয় বন্ধুও বটে। টিফিনের সময়ে কিংবা ফাঁকা ক্লাসে তিনি যখন গান শোনান, তখন ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের চোখে মুখে এক অন্যরকম আনন্দ দেখা যায়। তাদের প্রিয় স্যারের সঙ্গে গলা মিলিয়ে তারাও গুনগুনিয়ে ওঠে।
পেশা আর নেশাকে ভাস্কর বসু যেন এক সুতোয় বেঁধে ফেলেছেন। শিক্ষকতা তাঁর রুটি-রুজির উপায় হলেও, সংগীতই তাঁর আসল নেশা। গান লেখা, তাতে সুর দেওয়া, নিত্য নতুন গানে গলা মেলানো – এ সবই তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর এই বিরল প্রতিভা সত্যিই সমাজের কাছে এক দৃষ্টান্ত। বিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষকদের সহযোগিতায় তাঁর হাত ধরেই এই প্রান্তিক এলাকার বিদ্যালয়ে গড়ে উঠেছে সংস্কৃতির এক নতুন চর্চা কেন্দ্র। বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্য বইতে যখন বিভিন্ন ধরনের গান স্থান পেয়েছে, তখন ভাস্কর বসু স্যারের মতো শিক্ষকরা সুরে ও ছন্দে সেই গান গেয়ে বাচ্চাদের পড়িয়ে তাদের শিক্ষাগ্রহণের প্রক্রিয়াকে আরও আনন্দময় করে তুলছেন।
রবীন্দ্র সংগীত হোক বা আধুনিক গান অথবা লোকগীতি, ভাস্কর বসুর গলায় সবকিছুরই এক আলাদা মাধুর্য রয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ৭০ কিলোমিটার পথ যাতায়াত করে তিনি নিজের পেশার তাগিদে বিদ্যালয়ে আসেন। তবে এই দীর্ঘ পথের ক্লান্তি বা জীবনের ব্যস্ততা তাঁকে গান থেকে দূরে রাখতে পারেনি। বিদ্যালয়ে হাঁটতে হাঁটতে কিংবা অবসর সময়ে তিনি গুনগুনিয়ে গানের রেওয়াজ করেন। নদিয়া জেলায় জন্ম নেওয়া এই শিক্ষকের সঙ্গীতে হাতেখড়ি মায়ের কাছেই। সেই থেকে শুরু হওয়া তাঁর এই সংগীতময় জীবন আজও ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস। তাঁর এই অনন্য গুণ সকলকেই মুগ্ধ করে।