কাজের প্রলোভনে নারী পাচার চক্র, শিলিগুড়িতে ৩৪ যুবতী উদ্ধার, গ্রেফতার ৩

বন্ধ ও রুগ্ন চা বাগান অঞ্চলের দরিদ্রতাকে পুঁজি করে কাজের নামে নারী পাচারের একটি বড়সড় চক্রের পর্দা ফাঁস হল শিলিগুড়িতে। রবিবার বিকেলে এসএসবি (সশস্ত্র সীমা বল)-এর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে শিলিগুড়ি বাস টার্মিনাস থেকে মোট ৩৪ জন যুবতীকে উদ্ধার করেছে শিলিগুড়ি পুলিশ কমিশনারেটের প্রধাননগর থানার পুলিশ। এই ঘটনায় পেট্রাস বেক (মেটেলি), গৌতম রায় (হায়দারপাড়া, শিলিগুড়ি) এবং জয়শ্রী পাল (জনতানগর) নামে তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ধৃতরা অবশ্য নারী পাচারের অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, তারা কেবল চাকরির ব্যবস্থা করছিলেন।

পুলিশ সূত্রে খবর, উদ্ধার হওয়া যুবতীরা সবাই নাগরাকাটা, মেটেলি, বানারহাট-সহ ডুয়ার্সের চা বাগান অধ্যুষিত এলাকার বাসিন্দা। তাদের কোয়েম্বাটুরে একটি কাপড়ের সংস্থায় সেলাইয়ের কাজের প্রলোভন দেখিয়ে প্রথমে বাসে করে রাঁচি এবং সেখান থেকে ট্রেনে তামিলনাড়ুর কোয়েম্বাটুরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল বলে জানা গেছে।

পুলিশের বক্তব্য ও তদন্তের গতিপ্রকৃতি:

শিলিগুড়ি পুলিশ কমিশনারেটের ডিসিপি বিশ্বচাঁদ ঠাকুর জানিয়েছেন, “৩৪ জন যুবতীকে উদ্ধার করা হয়েছে। মূলত তারা সবাই ডুয়ার্সের চা বাগান অধ্যুষিত এলাকার বাসিন্দা। যুবতীদের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। কিছু চাকরির নথি উদ্ধার হয়েছে, সেগুলো যাচাই করা হচ্ছে। ঘটনায় আর কেউ জড়িত রয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি মানব পাচার রুখতে বিভিন্ন এলাকায় সচেতনতা শিবিরও করা হয়।” রেল পুলিশের সুপার কুনওয়ার ভূষণ সিং আরও জানান যে, রেল পুলিশও কমিশনারেটের সঙ্গে মিলে ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করবে। ধৃতদের সোমবার শিলিগুড়ি আদালতে তোলা হলে পাঁচদিনের পুলিশ হেফাজতের আবেদন জানানো হয়।

অভিযুক্তদের দাবি ও পরিবারের প্রতিক্রিয়া:

ধৃত গৌতম রায় নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেছেন, “আমরা কোনো অন্যায় বা বেআইনি কাজ করিনি। প্রত্যেকের চাকরির নথি রয়েছে। আমাদের ফাঁসানো হচ্ছে। প্রত্যেক যুবতী আঠারো বছরের ঊর্ধ্বে। প্রত্যেকের চাকরি বেছে নেওয়ার অধিকার রয়েছে। চাকরি সংক্রান্ত সমস্ত নথি আমরা পুলিশকে জমা দিয়েছি। এখন চা বাগান বন্ধ থাকায় রোজগার নেই। এতে আমাদের কিছু করার নেই। আমার পুলিশ ও আইনের উপর আস্থা রয়েছে।” গৌতম রায়ের মা চাঁদনি রায়ও তার ছেলেকে নির্দোষ দাবি করে জানান, তার ছেলে এর আগেও অনেককে চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছে।

পূর্ববর্তী ঘটনা ও পাচারকারীদের modus operandi:

এই ঘটনার মাত্র সাতদিন আগে, গত ২১শে জুলাই নিউ জলপাইগুড়ি রেল স্টেশনে ক্যাপিটাল এক্সপ্রেসে অভিযান চালিয়ে একইভাবে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে পাচারের আগে ৫৬ জন যুবতীকে উদ্ধার করেছিল রেল পুলিশ। সেই ঘটনাতেও তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়। ওই যুবতীদের তামিলনাড়ুর হুসুর জেলায় একটি ইলেকট্রনিকসের সংস্থায় চাকরি দেওয়ার নামে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।

দুটি ঘটনার নেপথ্যে একটি বিষয় পরিষ্কার: পাচারকারীরা প্রধানত তরাই ও ডুয়ার্স এলাকার বন্ধ ও রুগ্ন চা বাগান শ্রমিকদের পরিবারের যুবতীদেরই নিশানা করছে। আর্থিক অনটনের সুযোগ নিয়ে তাদের ভিনরাজ্যে মোটা টাকার চাকরির প্রলোভন দেখানো হচ্ছে। এমনকি, প্রয়োজনে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের নকল নথি ব্যবহার করেও পাচারকারীরা বিশ্বাস অর্জন করছে, আর যুবতী ও তাদের পরিবার সেই ফাঁদে পা দিচ্ছে। এই ঘটনায় উদ্ধার হওয়া যুবতীদের ইতিমধ্যেই তাদের পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। তবে এই ধরনের ঘটনা রুখতে প্রশাসনের আরও কঠোর পদক্ষেপ এবং সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা আবারও সামনে চলে এসেছে।