হুগলির চর খয়রামারিতে শিক্ষাব্যবস্থার করুণ দশা, ১২ লাখ টাকা খরচ করেও অকেজো নতুন স্কুল ভবন, টিনের চালই ভরসা ক্ষুদে পড়ুয়াদের

হুগলির বলাগড়ের চর খয়রামারি জিএসএফপি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষা পরিকাঠামোর বেহাল দশা ও সরকারি অর্থের চূড়ান্ত অপচয়ের এক মর্মান্তিক চিত্র সামনে এসেছে। প্রায় তিন বছর আগে গঙ্গার ভাঙনে পুরনো স্কুল ভবন তলিয়ে যাওয়ার পর কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে ১২ লক্ষ টাকা খরচ করে নতুন স্কুল বিল্ডিং তৈরি হয়। কিন্তু, জলাভূমির উপর নির্মিত হওয়ায় সেই নতুন ভবনও এখন অকেজো। ফলস্বরূপ, শিক্ষক-শিক্ষিকারা বাধ্য হয়ে টিন দিয়ে তৈরি এক অস্বাস্থ্যকর ও অস্থায়ী ঘরে ক্লাস নিচ্ছেন, যা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

নতুন ভবনের কপালে তালা, টিনের চালেই ভরসা

২০২৩ সালে স্থানীয় সুরেশ মণ্ডলের দান করা জমিতে নতুন স্কুল বিল্ডিংটি তৈরি হয়। তবে বর্ষাকাল আসতেই বিপত্তি বাধে। পাটক্ষেতের পাশে জলাভূমি হওয়ায় ভারী বৃষ্টি এবং জোয়ারের জলে নতুন স্কুলের সামনে হাঁটু সমান জল জমে যায়। এই জমা জল ও কাদামাটির কারণে শিক্ষার্থীরা নতুন ভবনে যেতে পারে না, ফলে বাধ্য হয়েই তারা ফিরে যায় টিনের চালে তৈরি পুরনো অস্থায়ী ক্লাসঘরে।

এই পরিস্থিতিতে স্কুলের শিক্ষার্থী সংখ্যাও কমতে শুরু করেছে। বর্তমানে চারটি ক্লাস মিলিয়ে মাত্র ৩৬ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। অস্থায়ী স্কুলে মশা ও পোকামাকড়ের উপদ্রব চরমে, এমনকি মিড-ডে মিল রান্নার পরিবেশও স্বাস্থ্যকর নয় বলে অভিযোগ উঠেছে। স্কুল কর্তৃপক্ষ বারবার প্রশাসনকে লিখিতভাবে জানালেও, স্কুলের সামনের অংশ উঁচু করা বা নতুন বিল্ডিং তৈরির কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

কর্তৃপক্ষের দায়সারা জবাব ও ভুল সিদ্ধান্তের দায়

বলাগড়ের বিডিও সুপর্ণা বিশ্বাস এই বিষয়ে দায়সারাভাবে বলেন, “স্কুলের পড়াশোনা বন্ধ হয়নি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে।” তবে কবে এই সমস্যার সমাধান হবে এবং কতদিন শিক্ষার্থীরা এমন অস্বাস্থ্যকর ও টিন ঘেরা ঘরে একসঙ্গে চারটি ক্লাসে পড়াশোনা করবে, সেই প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট উত্তর মেলেনি।

জেলার শিক্ষা দফতরের এক আধিকারিক (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানিয়েছেন, প্রথমে রাস্তার পাশে স্কুল তৈরির সিদ্ধান্ত থাকলেও স্থানীয়দের আপত্তিতে কিছুটা দূরে নিচু জমিতে এটি তৈরি হয়। পিলার দিয়ে উঁচু করে স্কুল হলেও, ক্লাসরুম ও শৌচাগারের ঘাটতি মেটাতে নিচের অংশে ঘর বানানো হয়, যা প্রতি বছর বর্ষায় ডুবে যায়। তিনি জানান, নতুন করে স্কুল সংস্কারের জন্য প্রশাসনের সমস্ত দফতরে লিখিত আবেদন দেওয়া আছে, কিন্তু কেন সমাধান হচ্ছে না, তা অজানা।

স্কুলের প্রধান শিক্ষক প্রদীপ মণ্ডল এবং হুগলির প্রাথমিক শিক্ষা সংসদের চেয়ারপার্সন শিল্পা নন্দী উভয়েই সমস্যার কথা স্বীকার করে নতুন বিল্ডিংয়ের জন্য আবেদন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন। তাঁরা বলেন, জমি না পাওয়ায় নিচু জমিতেই স্কুল তৈরি করতে হয়েছিল।

লক্ষাধিক টাকার সরকারি অর্থ অপচয় নিয়ে প্রশ্ন

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, জলাজমি হওয়া সত্ত্বেও কেন লক্ষাধিক টাকা খরচ করে সেখানে নতুন স্কুলটি তৈরি করা হলো? বলাগড় পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি শিখা প্রামাণিক নিজেই স্বীকার করেছেন, “সেই সময় ইঞ্জিনিয়াররা ভাবেননি প্রতিবছর জল উঠে যাবে। তাই লক্ষাধিক টাকা খরচ করে স্কুল করায় সরকারি টাকা নষ্ট হয়েছে। কিছু একটা ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।”

চুঁচুড়ার মহকুমাশাসক স্মিতা স্যানাল শুক্লা জানান, নিচু এলাকা হওয়ায় মাটি ফেলে উঁচু করতে অনেক টাকা লাগবে, যা কেবল সর্বশিক্ষা মিশনের পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি হুগলির সাংসদকে বিষয়টি জানিয়েছেন এবং সাংসদ তহবিল ও অন্যান্য খাতের টাকায় সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে।

স্থানীয় জিরাট গ্রাম পঞ্চায়েতের উপ-প্রধান তাপস পোদ্দার বলেন, “প্রতি বছর জলের কারণে দু’মাস স্কুল হয় না। স্বাস্থ্যবিধি মেনেই অস্থায়ী স্কুল চলছে।”

চর খয়রামারি জিএসএফপি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই পরিস্থিতি সরকারি পরিকল্পনার অভাব, সমন্বয়হীনতা এবং দায়িত্বজ্ঞানহীনতার এক জ্বলন্ত উদাহরণ। শিক্ষার্থীরা কবে একটি স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ পরিবেশে পড়াশোনার সুযোগ পাবে, সেটাই এখন লাখ টাকার প্রশ্ন।