বসিরহাট হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনে পুলিশ, ২৩ দিন পর বিহার থেকে অভিযুক্ত গ্রেফতার, কারণ ঘিরে ধোঁয়াশা

বসিরহাটের মধ্যমপাড়া এলাকায় সংঘটিত এক চাঞ্চল্যকর বিধবা খুনের ঘটনার ২৩ দিনের মাথায় অবশেষে মূল অভিযুক্তকে গ্রেফতার করলো পুলিশ। বিহারের বিড়োল থেকে বুধবার (২৩শে জুলাই) রাতে আবদুল হাসান মোল্লাকে বসিরহাট জেলা পুলিশ বিহার পুলিশের সহায়তায় ধরেছে। এই গ্রেফতারি হত্যাকাণ্ডের জট খুলতে সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে, তবে খুনের পেছনের মূল উদ্দেশ্য – পরকীয়া নাকি সম্পত্তির লোভ – তা এখনও তদন্তকারীদের কাছে স্পষ্ট নয়। ধৃতকে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের চেষ্টা চলছে।
রক্তাক্ত দেহ উদ্ধার ও প্রাথমিক তদন্ত
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ১লা জুলাই বসিরহাটের মধ্যমপাড়া এলাকার একটি বাড়ির ভেতর থেকে এক বিধবা মহিলার রক্তাক্ত দেহ উদ্ধার হয়। ওই মহিলা বাড়িতে একাই থাকতেন। তাঁর ছেলে কলকাতায় একটি বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত। ঘটনার দু’দিন ধরে মায়ের সঙ্গে তাঁর কোনো যোগাযোগ না হওয়ায় তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তৃতীয় দিন মায়ের ফোন সুইচ অফ পেয়ে তিনি বাড়ি ফিরে আসেন। সেখানে এসে দেখেন, দরজার বাইরে থেকে তালা লাগানো, ঘরের ভেতরে পাখা ঘুরছে এবং ভেতর থেকে পচা দুর্গন্ধ বেরোচ্ছে। খবর পেয়ে দ্রুত পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তালা ভেঙে ঘরের ভিতর থেকে ওই মহিলার রক্তাক্ত দেহ উদ্ধার করে। নিহত মহিলার ছেলে বসিরহাট থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
মোবাইল কল লিস্টে সূত্র, বিহারে পলাতক খুনির সন্ধান
প্রাথমিকভাবে খুনের কোনো সুস্পষ্ট সূত্র না পাওয়ায় পুলিশ কিছুটা ধন্দে ছিল। তবে নিহত মহিলার মোবাইলের কল লিস্ট ধরে তদন্ত এগিয়ে যেতেই পুলিশ একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হাতে পায়। তদন্তকারীরা জানতে পারেন, ওই পরিবারের পরিচিত আবদুল হাসান মোল্লা শেষবার ওই বাড়িতে এসেছিলেন। এরপর থেকেই তার ফোন নম্বরটিও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। অবশেষে তার ফোন চালু হতেই পুলিশ তার অবস্থান শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। আবদুল হাসান এলাকা ছেড়ে বিহারের বিড়োল এলাকায় গা-ঢাকা দিয়েছিল। বিহার পুলিশের সহযোগিতায় বুধবার তাকে গ্রেফতার করা হয়। ট্রানজিট রিমান্ডে তাকে রাতেই বসিরহাটে নিয়ে আসা হয়েছে এবং বৃহস্পতিবার তাকে নিজেদের হেফাজতে চেয়ে বসিরহাট মহকুমা আদালতে পেশ করেছে পুলিশ।
সম্পর্ক ও আর্থিক উদ্দেশ্য নিয়ে জল্পনা
পুলিশ সূত্রে আরও জানা গেছে, নিহত মহিলার স্বামী কয়েক বছর আগে মারা যান। এরপর থেকেই আবদুল হাসান মোল্লার সঙ্গে বিধবা ওই মহিলার একটি সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আবদুল হাসান মহিলার পূর্ব পরিচিত হওয়ায় নিয়মিত তাদের বাড়িতে তার যাতায়াত ছিল। পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, সম্পর্কের আড়ালে মহিলার টাকা-পয়সা ও সোনাদানা হাতানোই ধৃতের মূল উদ্দেশ্য ছিল। তবে মহিলা এতে রাজি না হওয়ায় এই খুনের ঘটনা ঘটেছে কিনা, পুলিশ সেই বিষয়টিও খতিয়ে দেখছে।
নিহত মহিলার ভাসুর শফিক মোল্লা বলেন, “ভাই মারা যাওয়ার পর আবদুল হাসান ভাইয়ের স্ত্রীর বাড়িতে যাতায়াত করত। শুনেছি, ওদের মধ্যে একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। ভাইয়ের রেখে যাওয়া অনেক টাকা পয়সা ও সোনার গয়না ছিল। সে সব কিছুই পাওয়া যায়নি। আমাদের ধারণা, খুনি আবদুলই সে সব হাতিয়ে নিয়ে পালিয়েছিল। আমরা চাই, ও’র কঠোর শাস্তি হোক।”
এই বিষয়ে বসিরহাট জেলার পুলিশ সুপার হোসেন মেহেদি রহমান বলেন, “খুনের পিছনে সম্ভাব্য সমস্ত দিকই খতিয়ে দেখছি আমরা। ধৃতকে হেফাজতে নিয়ে জেরা করলে বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে। তাই আমরা পুলিশি হেফাজত চেয়ে আবেদন করেছি আদালতে।” পুলিশের নিবিড় জেরায় এই হত্যাকাণ্ডের আসল রহস্য উন্মোচিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।