ওবিসি মামলায় হাইকোর্টের রায়কে চ্যালেঞ্জ, সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হলো রাজ্য সরকার

ওবিসি সংরক্ষণ তালিকা বাতিলের নির্দেশকে ঘিরে রাজ্য-কেন্দ্রের টানাপোড়েন এবার সুপ্রিম কোর্টে গড়ালো। কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশের বিরুদ্ধে রাজ্যের ওবিসি সার্টিফিকেট বাতিল মামলা দ্রুত শুনানির জন্য সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি বি. আর. গভাইয়ের এজলাসে এই আবেদন জানানো হয় এবং আগামী সোমবার (২৯শে জুলাই) এই মামলার শুনানি হতে পারে বলে জানা গেছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত জুন মাসে, যখন কলকাতা হাইকোর্ট ২০১০ সাল থেকে রাজ্যের প্রকাশিত ওবিসি তালিকা এবং সংশ্লিষ্ট সকল বিজ্ঞপ্তির ওপর অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ জারি করে, যা ৩১শে জুলাই পর্যন্ত বলবৎ থাকার কথা ছিল। বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী ও বিচারপতি রাজাশেখর মান্থার ডিভিশন বেঞ্চ রাজ্য সরকারের পোর্টাল চালু করে কাস্ট সার্টিফিকেট জমা দেওয়ার আবেদন জানানোর নির্দেশের ওপরও স্থগিতাদেশ দেয়।
কলকাতা হাইকোর্ট তার পর্যবেক্ষণে জানায়, ২০১০ সাল থেকে দেওয়া সমস্ত ওবিসি শংসাপত্রগুলির ভিত্তি দুর্বল এবং পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ ছাড়া এই তালিকা তৈরি হয়েছে। এর ফলে ২০১০ সালের পর থেকে ওবিসি-তে নথিভুক্ত হওয়া বহু মানুষের শংসাপত্র বাতিল হয়ে যায়। তবে ২০১০ সালের আগে পর্যন্ত যে ৬৬টি জনগোষ্ঠী অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত ছিল, তাদের শংসাপত্র চাকরি ও ভর্তির ক্ষেত্রে গ্রাহ্য হবে বলে জানানো হয়। এই নির্দেশের ফলে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থী সমস্যার সম্মুখীন হন।
সুপ্রিম কোর্টে রাজ্যের আর্জি: কনটেম্পট ও দ্রুত শুনানির আবেদন
বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টে রাজ্যের পক্ষে সওয়াল করেন বরিষ্ঠ আইনজীবী কপিল সিব্বল। তিনি প্রধান বিচারপতিকে জানান, “আমরা এই বিষয়টি আগেও তুলেছিলাম। পরে আমরা তা প্রত্যাহার করি। আমরা কলকাতা হাইকোর্টের রায় অনুসরণ করে সাব-ক্লাসিফিকেশন করেছি। এখন হাইকোর্ট আমাদের বিরুদ্ধে কনটেম্পট (অবমাননা মামলা) তালিকাভুক্ত করেছে!” এই গুরুতর পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিব্বল বিষয়টির জরুরি তালিকাভুক্তির জন্য আর্জি জানান। প্রধান বিচারপতি বি. আর. গভাই তাঁর আবেদন গ্রহণ করে বলেন, “আমরা এটি আগামী সপ্তাহে তালিকাভুক্ত করব।” আদালত সূত্রের খবর, মামলা দায়েরের অনুমতি দেওয়া হয়েছে এবং আগামী সোমবার (২৯শে জুলাই) শুনানি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
হাইকোর্টের স্থগিতাদেশের মেয়াদ বৃদ্ধি
এদিকে, সুপ্রিম কোর্টে মামলার আবেদন জানানোর দিনেই কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তীর ডিভিশন বেঞ্চ ওবিসি তালিকা প্রকাশের ওপর স্থগিতাদেশের মেয়াদ ৩১শে জুলাই থেকে বাড়িয়ে ৩১শে অগাস্ট পর্যন্ত করেছে। এটি রাজ্যের জন্য আরও একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাজ্যের নতুন তালিকা ও বিতর্ক
উল্লেখ্য, মামলাকারীদের দাবি ছিল যে, ওবিসি তালিকার নাম নথিভুক্তকরণ সঠিকভাবে সমীক্ষা করে হয়নি এবং জেলাভিত্তিক কয়েকটি পরিবারের মধ্যে সমীক্ষা সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল। আদালতের নির্দেশ ছিল সামাজিক, আর্থিক এবং পেশাগতভাবে ভিন্ন রাজ্যের সব জনগোষ্ঠীর মধ্যে সমীক্ষা করতে হবে। সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিধানসভায় ওবিসি নিয়ে রাজ্যের অবস্থান স্পষ্ট করে জানান, আদালতের নির্দেশ মেনে ওবিসিদের নতুন তালিকা তৈরি করা হয়েছে, যেখানে ১৪০টি জনগোষ্ঠীকে ওবিসি হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের এই দ্রুত শুনানি এবং হাইকোর্টের বর্ধিত স্থগিতাদেশের প্রেক্ষাপটে ওবিসি সংরক্ষণ বিতর্ক এখন আরও জটিল রূপ ধারণ করেছে। আগামী দিনে আদালতের রায় এই গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যুতে কী প্রভাব ফেলে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।