অসুস্থ মাকে কিল-ঘুষি-লাথি, অমানবিক অত্যাচারে বৃদ্ধার মৃত্যু! অভিযোগের আঙ্গুল ছেলে-বউমার বিরুদ্ধে

পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার দাসপুর থানার তিয়োরবেড়িয়া গ্রামের পাইন পাড়ায় ঘটে গেল এক হৃদয়বিদারক ঘটনা। অসুস্থ বৃদ্ধা মা ডলি পাইনকে (৬৭) মুখে গামছা বেঁধে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ, কিল, চড়, ঘুষি এবং লাথি মারার এক হাড়হিম করা ভিডিও সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। এই অমানবিক নির্যাতনের পর ওই বৃদ্ধা মায়ের মৃত্যু ঘটেছে। অভিযোগ, ছেলে বাবলু পাইন এবং তার স্ত্রী মিলে দীর্ঘদিন ধরে বৃদ্ধার উপর এই নির্যাতন চালাচ্ছিল।

ভিডিওতে অমানবিকতা:

ভাইরাল হওয়া ভিডিওটিতে দেখা যাচ্ছে, মাঝবয়সী এক ব্যক্তি, যার মুখে গামছা বাঁধা, তিনি তার অসুস্থ বৃদ্ধা মাকে নির্মমভাবে মারধর করছেন। সেখানেই শেষ নয়, মারধরের পর তিনি বৃদ্ধার হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে গিয়ে তার স্ত্রীর পায়ের কাছে ফেলে দিচ্ছেন। এরপর চেয়ার বসে থাকা স্ত্রীর পায়ের কাছে বৃদ্ধার মাথা ঠেকিয়ে বলতে শোনা যায়, “ক্ষমা চা। পা ধরে বল আর করবি না।” এই দৃশ্য দেখে শিহরিত হচ্ছেন নেটিজেনরা।

অত্যাচারের কারণ ও পরিণাম:

জানা গেছে, অভিযুক্ত ছেলের নাম বাবলু পাইন, পেশায় একজন টোটোচালক। তার ৬৭ বছর বয়সী বৃদ্ধা মা ডলি পাইন দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। অভিযোগ, ছেলে-বউমার তার চিকিৎসা ও দেখভালের ন্যূনতম ইচ্ছা ছিল না। বরং, প্রতি মুহূর্তে অমানবিক নির্যাতন চলতো এবং তার মৃত্যু কামনা করা হত বলে অভিযোগ উঠেছে। একাংশ প্রতিবেশীর কথায়, বাড়িতে অসুস্থ বৃদ্ধা মা যেন ছেলে, বউমা এবং নাতনির কাছে ‘চোখের বিষ’ হয়ে উঠেছিলেন। কোনো মতেই তাকে সহ্য করতে পারছিল না পরিবার। দিনের পর দিন তার উপর নির্মমভাবে লাথি, কিল, চড়, ঝাঁটা দিয়ে অত্যাচারের মাত্রা বাড়তে থাকে। অবহেলার শেষ পরিণতি হয় বৃদ্ধার মৃত্যু।

পুলিশি নিষ্ক্রিয়তা ও এলাকাবাসীর ক্ষোভ:

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, ছেলে-বউমার এই কুকীর্তি যাতে প্রকাশ্যে না আসে, তার জন্য প্রতিবেশীরাই নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে বিষয়টি মিটমাট করে নিয়েছেন। ফলে, এই ঘটনায় এখনও পর্যন্ত দাসপুর থানায় কোনো অভিযোগ দায়ের হয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ আধিকারিক জানিয়েছেন, “আমাদের কাছে এখনও পর্যন্ত কোনো অভিযোগ আসেনি। যদি অভিযোগ জমা পড়ে অবশ্যই আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখব।”

তবে অত্যাচারের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর এই ঘটনায় তীব্র নিন্দার ঝড় উঠেছে। এলাকাবাসী সরলা জানা বলেন, “আমরা ঘটনার কথা শুনেছি। বৃদ্ধাকে মারধর সংক্রান্ত একটা ভিডিও দেখেছি। ওই বৃদ্ধাকে ঘরে নির্যাতন করা হত বলে জানতে পেরেছি। এটা খুব নিন্দাজনক ঘটনা। ওদের বাড়িতে আজ হয়েছে, আগামীদিনে অন্য কারও বাড়িতে ঘটবে। তাই আমরা এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক স্কুলশিক্ষিকা বলেন, “আমরা বিভিন্নজনের কাছ থেকে শুনেছি ও জেনেছি যে এরকম ধরনের একটা ঘটনা ঘটেছে এলাকায়। আমরা মানুষ গড়ার কারিগর। এইরকম একটা জায়গা থেকে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও ধিক্কার জানাচ্ছি। পাশাপাশি আমরা এও অনুরোধ জানাচ্ছি, কোনো মা-বাবার প্রতি এ ধরনের আচরণ যেন সন্তান কোনোদিন না করে।”

এই অমানবিক ঘটনা ভারতীয় সমাজে বয়স্কদের প্রতি অবহেলা এবং নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে, যেখানে এমনকি চরম নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পরও আইনি পদক্ষেপ নিতে বিলম্ব হচ্ছে। সমাজ সচেতনতার পাশাপাশি প্রশাসনকেও আরও সক্রিয় হওয়ার দাবি উঠেছে।