বিশেষ: বিশ্বের কোথায় রয়েছে ট্রেন-গাড়ি-টায়ারের কবরস্থান? জেনেনিন সেই ঠিকানা?

মানুষের জীবন যেমন একদিন শেষ হয়, তেমনি একসময় কর্মক্ষমতা হারিয়ে থেমে যায় যন্ত্রেরও দৌড়। এই নীরব বিদায় শুধুমাত্র মেশিনেরই নয়, যেন এক মহাকাব্যের অন্তিম অধ্যায়। প্রতিদিন আমরা যেসব গাড়ি, ট্রেন, জাহাজ, এমনকি বিমান দেখি ছুটে চলতে, তাদেরও একটা ‘শেষ ঠিকানা’ আছে — যাকে বলা যায় যানবাহনের কবরস্থান।

চলুন একনজরে দেখে নেওয়া যাক, বিশ্বজুড়ে এমন কিছু আশ্চর্যজনক কবরস্থানের গল্প।

১. চীনের গাড়ির কবরস্থান: সবুজে ঢাকা লোহালক্কড়
হাংঝো শহরের পাশে চীনের এক বিস্ময়কর গাড়ির কবরস্থান রীতিমতো সিনেমার দৃশ্যের মতো। শত শত পরিত্যক্ত বৈদ্যুতিক গাড়ি পড়ে আছে সেখানে। গাড়িগুলোর উপর গজিয়ে উঠেছে গাছপালা, বদলে গেছে চেহারা।
২০১৮ সালে বৈদ্যুতিক গাড়ির উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো যানগুলো ছুঁড়ে ফেলে দিতে থাকে মানুষ। সেই পরিত্যক্ত গাড়িগুলো জমে এক ভয়ঙ্কর সুন্দর কবরস্থানে রূপ নেয়।

২. ট্রেন কোচের কবরস্থান: থেসালোনিকির নিঃসঙ্গ বনভূমি
গ্রিসের থেসালোনিকি শহরের এক কোণে পড়ে আছে শত শত পুরোনো ট্রেনের কোচ। এগুলো ১৯৮০-র দশক থেকে ব্যবহার বন্ধ হওয়ায় জমা করা হয় সেখানে।
কিছু কোচ স্ক্র্যাপ হিসেবে নিলামে তোলা হলেও অধিকাংশই পড়ে আছে জংধরা অবস্থায়। জায়গাটি যেন হারিয়ে যাওয়া কোনো সময়ের নিঃশব্দ সাক্ষী।

৩. জাহাজের কবরস্থান: টাঙ্গালুমার ডুবে যাওয়া ধ্বংসাবশেষ
অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনের টাঙ্গালুমা সমুদ্রতটে চোখে পড়ে প্রায় ১৫টি পরিত্যক্ত জাহাজ। বিশাল লোহার দেহগুলো ঢেউয়ের সাথে লড়াই করছে দীর্ঘদিন ধরে।
এই এলাকাটি এখন পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় স্থান। ভারতেও খাম্বাত উপসাগরে এমন কবরস্থান রয়েছে, যেখানে বিশাল ক্রুজ জাহাজ কেটে ফেলা হয় স্ক্র্যাপের জন্য।

৪. টেলিফোন বুথের কবর: স্মার্টফোন যুগে হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি
স্মার্টফোনের আগমনে হারিয়ে গেছে লাল রঙের ঐতিহ্যবাহী টেলিফোন বুথগুলো। আজ সেগুলো পড়ে আছে একত্রে, ধূলিধূসরিত অবস্থায়।
পুরোনো দিনের সাক্ষ্য বহন করা এই বুথগুলো যেন দাঁড়িয়ে আছে নীরব প্রতিবাদ করে— আধুনিকতার নামে অতীতকে ভুলে যাওয়ার বিরুদ্ধে।

৫. টায়ারের কবরস্থান: কুয়েতের আগ্নেয়গিরি সদৃশ জমি
কুয়েতের সুলাইবিয়াতে রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম টায়ার কবরস্থান। গত ১৭ বছরে প্রায় ৪ কোটিরও বেশি টায়ার ফেলা হয়েছে সেখানে।
এই জমি এখন এতটাই বিস্তৃত যে, স্যাটেলাইট ইমেজেও স্পষ্ট দেখা যায়। সরকার এখন এই টায়ারগুলো পুনর্ব্যবহারের উদ্যোগ নিচ্ছে।

৬. বিমানের কবরস্থান: আকাশ ছোঁয়া স্বপ্নের ভাঙা ডানা
আমেরিকার অ্যারিজোনায় অবস্থিত ডেভিস-মন্থান বেস বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিমান কবরস্থান। এখানে ৩২০০টিরও বেশি বিমান, হাজার হাজার ইঞ্জিন এবং যন্ত্রাংশ পড়ে আছে।
প্রযুক্তির গর্ব, আকাশের জয়, আজ মাটির উপর বিশ্রাম নিচ্ছে নিঃশব্দে। এটি শুধু একটি কবরস্থান নয়, বরং আধুনিক সভ্যতার ‘স্মৃতির ক্যানভাস’।

শেষ কথা
প্রযুক্তি যত এগোচ্ছে, ততই তৈরি হচ্ছে নতুন, পরিত্যক্ত হচ্ছে পুরোনো। মানুষের মতোই এসব যানবাহনেরও এক সময়ে পরিণতি হয়। তারা হয়তো আর চলেনা, কিন্তু তাদের অস্তিত্ব এখনও বলে— ‘আমি ছিলাম, আমি কিছু একটার অংশ ছিলাম।’

এইসব কবরস্থান যেন আমাদের শেখায়, প্রযুক্তির উত্থান যেমন অবধারিত, তেমনি পতনও অনিবার্য।