বিশেষ: ভয়ানক বিমান দুর্ঘটনার কবলে পরে ৪২ জন যাত্রী, খিদের জ্বালায় খেয়েছিলেন নর মাংসও!

১৯৭২ সালের ১৩ই অক্টোবর, আন্দিজ পর্বতমালায় উরুগুয়ের বিমানবাহিনীর একটি চার্টার্ড বিমান ভেঙে পড়ার ভয়াবহ ঘটনা আজও মানবজাতির টিকে থাকার অদম্য ইচ্ছার এক করুণ উপাখ্যান। ৪২ জন যাত্রীর মধ্যে ২৯ জন দুর্ঘটনার দিনই প্রাণ হারান। এরপর তিন সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে তুষারধসে আরও ১৩ জনের মৃত্যু হয়। কিন্তু ভাগ্যক্রমে, এই ভয়াবহতার মধ্যেও বেঁচে যান ১৬ জন যাত্রী, যারা ৭২ দিন ধরে পাহাড়ের খাঁজে আটকে থেকে এক কল্পনাতীত জীবন-মৃত্যুর সংগ্রাম চালিয়েছিলেন। খাবার ও জলের অভাবে এক সময় তারা বাধ্য হয়েছিলেন ‘নরখাদক’ রূপে আবির্ভূত হতে, সহযাত্রীদের মাংস পুড়িয়ে খেয়ে ক্ষুধা নিবারণ করতে।

‘নরখাদক’ রবার্তো কানেসা: অনুশোচনা নয়, বেঁচে থাকার সম্মান

সেই ১৬ জন জীবিত যাত্রীর অন্যতম, রবার্তো কানেসা, দুর্ঘটনার ৫০তম বার্ষিকীতে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট-এর এক প্রতিবেদনে সেই বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করেছেন। ‘মিরাক্যাল ইন দ্য আন্দিজ’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে তিনি জানান, যখন প্রাণ যায় যায় অবস্থা, তখন তিনি মন্টেভিডিও মেডিকেল কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র রবার্তো নিজেই প্রথম ভাঙা কাঁচ দিয়ে সহযাত্রীদের মাংস খুবলে তা ঝলসিয়ে খাওয়া শুরু করেন। তাকে এভাবে ‘নরখাদক’ রূপে দেখে বেঁচে থাকা অন্যরাও একই পথ অবলম্বন করতে বাধ্য হন।

রবার্তো বলেন, “আমাকে পরে সেসব সহযাত্রীর পরিবারের কাছে গিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে হয়েছিল।” বেঁচে থাকার জন্য এমন চরম পদক্ষেপ নিলেও তাঁর মনে কোনো অনুশোচনা নেই। বরং তিনি মনে করেন, যদি তিনি মারা যেতেন এবং অন্যরা যদি বাঁচার জন্য তাঁর মাংস খেয়ে ফেলতেন, তবে তিনি এটিকে সম্মান হিসেবেই বিবেচনা করতেন।

‘বন্ধুরা ছিল বিশ্বের প্রথম অঙ্গদাতা’: র‌্যামন সাবেললা

বেঁচে ফেরা আরেক যাত্রী র‌্যামন সাবেললা ১৩ই অক্টোবরের সেই অনুষ্ঠানে বলেন, “অবশ্যই মানুষের মাংস খাওয়ার এই ধারণা ছিল ভয়ানক ও ঘৃণ্য। বন্ধুদের মাংস মুখে তোলাও ছিল কঠিন। কিন্তু নিরুপায় আমরা সেটা করতে করতে একসময় অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। একটা দিক বিবেচনায় নিলে আমাদের বন্ধুরা ছিল বিশ্বে প্রথম, যারা নিজেদের অঙ্গদান করেছিল। জীবন-মৃত্যুর সে সন্ধিক্ষণে মাংস খাওয়ার সুযোগ করে দিয়ে বেঁচে থাকতে সাহায্য করেছিল।” তাঁর এই বক্তব্য সেই চরম পরিস্থিতির মানসিক জটিলতা ও বেঁচে থাকার জন্য তাদের আত্মবলিদানের অনুভূতিকে ফুটিয়ে তোলে।

উদ্ধার অভিযান ও শেষ রক্ষা:

দুর্ঘটনার শিকার সেই চার্টার্ড বিমানটি উরুগুয়ে থেকে চিলি যাচ্ছিল, যার প্রধান যাত্রী ছিলেন একটি রাগবি দলের সদস্য এবং তাদের পরিবার-বন্ধুবান্ধব। পথে বিকট শব্দে বিমানটি আন্দিজ পর্বতের ওপর ভেঙে পড়ে এবং জীবিতরা তুষারের মধ্যে আটকা পড়েন।

প্রথমদিকে উদ্ধারকর্মীরা জীবিতদের উদ্ধারের চেষ্টা চালালেও ভারী তুষারের কারণে কাউকে শনাক্ত করতে পারেননি। ১০ দিন পর জীবিতরা রেডিওর মাধ্যমে জানতে পারেন যে, প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে তাদের উদ্ধারের অভিযান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এই খবর তাদের মনে চরম হতাশা আনলেও, তারা কোনো চেষ্টা না করে সহযাত্রীদের মাংস খাওয়া শুরু করেননি। বরং রবার্তো ও প্যারাদো সাহায্যের খোঁজে ১০ দিনের এক দুঃসাহসিক যাত্রা শুরু করেন, যদিও প্রথমে তারা ব্যর্থ হন।

অবশেষে, ১৯৭২ সালের ২২শে ডিসেম্বর একটি হেলিকপ্টারে করে উদ্ধারকারী একটি দল দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং পরদিন ২৩শে ডিসেম্বর সেই ১৬ জন যাত্রীকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। এই অবিশ্বাস্য ঘটনা নিয়ে পিয়ের্স পল নামে এক লেখক ‘অ্যালাইভ: দ্য স্টোরি অব আন্দিজ সারভাইভার্স’ নামে একটি বই লেখেন, যা ১৯৯৩ সালে হলিউডে একটি চলচ্চিত্র হিসেবেও মুক্তি পায়। ৫০ বছর পেরিয়েও আন্দিজের এই অলৌকিক বেঁচে ফেরার গল্প মানবজাতির ইচ্ছাশক্তি ও চরম প্রতিকূলতায় টিকে থাকার এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।