বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে মমতা শঙ্কর, স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতর্কে কী বললেন মানসী-মৌসুমী?

যুগ যুগ ধরে চলে আসা ঋতুস্রাব বিষয়ক ‘ট্যাবু’র বিরুদ্ধে যখন সমাজ একুশ শতকে দাঁড়িয়েও লড়াই করছে, ঠিক তখনই পদ্মশ্রী মমতা শঙ্করের (Mamata Shankar) স্যানিটারি ন্যাপকিন (sanitary pad) নিয়ে করা ব্যক্তিগত মন্তব্য নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ছেলে বা বাবাকে ঋতুমতীর সময়ে স্যানিটারি প্যাড আনতে বলাটা লজ্জার বলে তাঁর মত, যা অনেকের কাছেই পুরোনো ধ্যান-ধারণার প্রতিফলন।

তবে, এই প্রসঙ্গে কলকাতার বুদ্ধিজীবী মহলে ভিন্ন মত প্রকাশ পাচ্ছে। অভিনেত্রী-পরিচালক মানসী সিনহা (Manasi Sinha) তীব্র আপত্তি জানিয়ে বলেছেন, তিনি মমতা শঙ্করের এই মতাদর্শকে বিশ্বাস করেন না বা মানেন না। ইটিভি ভারতকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মানসী বলেন, “আমার মতে উনি যা বলেছেন তা আমি বিশ্বাস করি না, মানিও না। অনেককেই দেখছি সোশ্যাল মিডিয়ায় ওনাকে অশ্লীল ভাষায় আক্রমণ করছেন, সেটা উচিত নয়। উনি একজন সিনিয়র মানুষ।”

মানসী সিনহা তাঁর যমজ ছেলে-মেয়ের উদাহরণ টেনে বলেন, তাঁর বাড়িতে প্রথম থেকেই এমন পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে যেখানে কোনো রকম ‘সামাজিক ট্যাবু’র জায়গা নেই। তিনি বলেন, “আমার ছেলে যখন মান্থলি শপিং করতে যায়, তখন আমার মেয়ে বৃষ্টি স্যানিটারি ন্যাপকিনও কিনে নিয়ে আসে।” তিনি আরও যোগ করেন, “ওরা যখন একসঙ্গে খেলে তখন বৃষ্টির যদি পিরিয়ডস চলে, আমার ছেলেই বন্ধুদের বলে, বৃষ্টিতে বেশি যাতে দৌড়াদৌড়ি না করানো হয়। ওর শরীর ভালো নেই। আসলে আমার বাড়িতে এইসব নেই। আমি ছোট থেকেই ছেলেকে শিখিয়েছি, বোনের দায়িত্ব তোমার। আর দায়িত্ব মানে সবদিকের দায়িত্ব, তার মধ্যে এটাও পড়ে। আর মেয়েকে বলেছি, এটা তোমার কাছে সম্মানের। তোমার পিরিয়ডস হচ্ছে মানে তুমি মা হওয়ার উপযুক্ত। এটা লুকিয়ে রাখার জিনিস নয়, স্বাভাবিক। এটা ভীষণ গর্বের বিষয় একটা মেয়ের কাছে। মমতা শঙ্করদি পুরোনো দিনের মানুষ। উনি সময়ের সঙ্গে নিজেকে পাল্টাতে পারেননি। পাল্টানো মানে ভুলগুলি মেনে নেওয়া নয়।”

পোশাক প্রসঙ্গেও পরিচালিকা তাঁর মতামত জানান। তিনি বলেন, “এই যে মেয়েরা ছোট ছোট জামাকাপড় পরে নিজেদের এক্সপোজ করে, এটা যে সবসময় সর্বক্ষেত্রে আমারও যে ভালো লাগে তা কিন্তু নয়। তার কারণ সবাই ওই ধরনের পোশাক ক্যারি করতে পারে না।” তিনি ধর্ষণ প্রসঙ্গে প্রচলিত একটি ভুল ধারণাকেও চ্যালেঞ্জ করেন, “যদি কেউ বলেন, ছোট পোশাক পরা মেয়েদের দেখে ছেলেদের অন্য মেয়েদের ধর্ষণ করার প্রবণতা বাড়ে, তা হলে কি ধরে নিতে হয় যবে থেকে এদেশে ছোট জামা ঢোকেনি তার আগে দেশে কোনো মেয়ে ধর্ষিতা হননি? এটা হয় কখনও?”

তবে, এই বিতর্কে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে মতামত দিয়েছেন অভিনেত্রী মৌসুমী ভট্টাচার্য (Mousumi Bhattacharya)। তিনি মমতা শঙ্করকে কটাক্ষ না করে যুক্তি দিয়ে ভাবনাচিন্তা করার অনুরোধ করেছেন। মৌসুমী ইটিভি ভারতকে বলেন, “যদি না কোনো এমারজেন্সি হয়, তাহলে একজন মা দুম করে ১২-১৩ বছরের ছেলেকে বা ১৮ বছরের ছেলেকে বলতে পারবে ‘তুই আমার স্যানিটারি প্যাডটা এনে দে’? পারবে কি? একজন ২৩-২৫ বছরের মহিলা বা ৩০ বছরের মহিলা দুম করে বয়স্ক বাবাকে কি বলতে পারবে স্যানিটারি প্যাড কেনার কথা?”

মৌসুমীর কথায়, “চিকিৎসকদের কথা আলাদা। আসলে ছোট থেকে আমরা এই বিষয়ে মা-দিদিকে বলেই অভ্যস্ত। ওই কালচারেই মানুষ হয়েছি। সেইদিক থেকে দাঁড়িয়ে কোনো মানুষ যদি ভোকাল হয় তাহলে অসুবিধাটা কোথায়? আমরা এত মর্ডান। আজকে একটা ছেলে যদি তাঁর স্ত্রী বা বান্ধবীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক গঠন করতে চায়, তাহলে সে কি তাঁর বাবা-মাকে বলতে পারবে, কন্ডোমটা কিনে এনে দাও? পারবে কি? অত ধকে কোলাবে না। মেয়েদের তাও ধকে কুলায়। এমারজেন্সিতে ভাইকে বা দাদাকে বা বাবাকে বলতে পারবে স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনে এনে দেওয়ার কথা। বা কাগজে লিখে দিল। কিন্তু একটা ছেলের সেই সাহস থাকবে কি বাবাকে কন্ডোমের প্যাকেট কিনে এনে দিতে বলবে?”

মৌসুমী ভট্টাচার্য উপসংহারে বলেন, “আমি মমতা শঙ্করদির কথা সাপোর্ট করছি না, কিন্তু যদি এই ভাবে ভাবি তাহলে উনি খুব একটা ভুল কিছু বলেননি। যতই আমরা মডার্ন হয়ে যাই না কেন, বাঙালি সংস্কৃতি, শিক্ষায় মেয়েদের এইটুকু লজ্জা তো রাখতে হবে। ন্যাংটো হয়ে ঘুরে বেড়ানো মডার্ন নয়। এই আধুনিক হওয়ার চক্করে মানুষ শিক্ষাটা ভুলে যাচ্ছে। জানার কোনো ইচ্ছা নেই। কেন মমতা শঙ্কর এমনটা বলেছেন তা নিয়ে ভাবার কোনো ইচ্ছা নেই। কিন্তু তাঁকে নিয়ে সমালোচনা করা হচ্ছে। তাঁর শিক্ষা নিয়ে, ক্যারিয়ার নিয়ে কোনো অভিজ্ঞতা আছে কারোর? পরিস্থিতির খাতিরে বলাই যায়। কিন্তু আমাকেও ভাবতে হবে, যদি বাবা-দাদা আমাকে কন্ডোমের প্যাকেট আনতে বলে তাহলে কি সেটা ভালো লাগবে শুনতে? মমতা শঙ্করদি বুদ্ধিহীন, অশিক্ষিত বোকা মহিলা কিন্তু নন। উনি যে কথাগুলো বলেন ভীষণ ভেবেচিন্তেই বলেন। এই ধরনের সংস্কৃতি দেখে বিরক্ত হয়ে বলেন।”

এই বিতর্কে সামাজিক রীতিনীতি, আধুনিকতা এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার মতো বিষয়গুলো নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।