প্রমাণই নেই কোনও, মুম্বইয়ে ভয়াবহ ট্রেন বিস্ফোরণের ১২ অভিযুক্ত পেলেন বেকসুর খালাস

২০০৬ সালের মুম্বই লোকাল ট্রেন বিস্ফোরণ মামলায় এক যুগান্তকারী রায়ে বম্বে হাইকোর্ট আজ ১১ জন অভিযুক্তকে নির্দোষ ঘোষণা করেছে। বিচারপতি অনিল কিলোর এবং বিচারপতি এস.জি. চন্দকের ডিভিশন বেঞ্চ এই রায় দিয়েছে, যা তদন্তকারী সংস্থাগুলির জন্য একটি বিশাল ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই মামলার চূড়ান্ত রায়দান দেশের বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হলো।
নিম্ন আদালতের রায় খারিজ, প্রমাণের দুর্বলতা প্রকট
প্রসঙ্গত, ২০১৫ সালে নিম্ন আদালত এই মামলায় মোট ১২ জন অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করেছিল। তাদের মধ্যে ৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৭ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। তবে, বম্বে হাইকোর্টে দীর্ঘ শুনানির পর, ১১ জন অভিযুক্তকে আজ খালাস দেওয়া হলো। মামলার একজন অভিযুক্ত, কামাল আনসারী, ২০২২ সালে কোভিড-১৯-এর কারণে জেলেই মারা গিয়েছিলেন।
আদালতের সূত্র অনুযায়ী, এই মামলার চূড়ান্ত শুনানি চলতি বছরের জানুয়ারিতে সম্পন্ন হয়, যার পর রায় সংরক্ষিত রাখা হয়েছিল। দোষীরা ইয়েরওয়াড়া, নাসিক, অমরাবতী এবং নাগপুর জেলে থেকে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে আদালতে তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করে। হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চ তার রায়ে স্পষ্টভাবে বলেছে যে, “মামলায় উপস্থাপিত প্রমাণ নির্ভরযোগ্য ছিল না” এবং “অনেক সাক্ষীর সাক্ষ্য সন্দেহজনক ছিল”। আদালত আরও উল্লেখ করেছে যে অভিযুক্তদের জোরপূর্বক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল এবং তাদের বক্তব্য নেওয়া হয়েছিল, যা আইনত বৈধ নয়।
‘প্রসিকিউশন সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ’: আদালতের কড়া পর্যবেক্ষণ
আদালত তার পর্যবেক্ষণে বলেছে, “প্রসিকিউশন সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে।” অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে উপস্থাপিত প্রমাণে গুরুতর ত্রুটি রয়েছে বলে আদালত মনে করেছে। আসামিপক্ষের যুক্তি, যা শনাক্তকরণ প্যারেডকে চ্যালেঞ্জ করেছিল, তাকে ন্যায্য বলে বিবেচনা করা হয়েছে। কিছু সাক্ষী বছরের পর বছর ধরে নীরব থাকার পর হঠাৎ করে অভিযুক্তকে শনাক্ত করেছিলেন, যা আদালত ‘অস্বাভাবিক’ বলে আখ্যা দিয়েছে। এছাড়াও, এর আগেও অনেক সাক্ষী একই ধরণের মামলায় হাজির হয়েছিলেন, যা তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। RDX এবং অন্যান্য বিস্ফোরক উপাদান উদ্ধারের বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি বলেও আদালত উল্লেখ করেছে।
বিধ্বংসী বিস্ফোরণে ১৮৯ জনের প্রাণহানি
২০০৬ সালের ১১ জুলাই, মাত্র ১১ মিনিটের ব্যবধানে মুম্বইয়ের লোকাল ট্রেনের সাতটি স্থানে ধারাবাহিক বোমা বিস্ফোরণ ঘটেছিল। এই ভয়াবহ হামলায় ১৮৯ জন নিরপরাধ মানুষের প্রাণহানি ঘটে এবং ৮২৪ জন আহত হন। বোমাগুলিতে RDX ব্যবহার করা হয়েছিল। ঘটনার পর মুম্বই ATS ২০০৬ সালের নভেম্বরে চার্জশিট দাখিল করে।
আসামিপক্ষ অভিযোগ করেছিল যে, Maharashtra Control of Organised Crime Act (MCOCA) আইনের অধীনে রেকর্ড করা স্বীকারোক্তিগুলি ‘জোরপূর্বক’ এবং ‘নির্যাতনের’ মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়েছিল এবং তাই সেগুলি অবৈধ। অন্যদিকে, রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিল যে এটি বিরলতম মামলাগুলির মধ্যে একটি এবং অপরাধীদের শাস্তি ন্যায্য ছিল।
দীর্ঘসূত্রিতা ও আদালতের পর্যবেক্ষণ
২০১৫ সালে হাইকোর্টে এই মামলার শুনানি শুরু হয়েছিল যখন রাষ্ট্রপক্ষ মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করার জন্য একটি আবেদন করে এবং দোষীরাও নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে। দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার কারণে, ১১টিরও বেশি বেঞ্চ পরিবর্তন করা হয়, তবে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে একটি বিশেষ বেঞ্চ গঠন করা হয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে শুনানি শেষ হওয়ার পর সিদ্ধান্ত সংরক্ষিত রাখা হয়েছিল।
আদালত তার রায়ে জোর দিয়ে বলেছে, “সাক্ষ্য, তদন্ত এবং প্রমাণ শক্তিশালী ছিল না। অভিযুক্তরা প্রমাণ করতে সফল হয়েছে যে তাদের কাছ থেকে জোর করে স্বীকারোক্তি নেওয়া হয়েছিল।” বিচারকরা বলেন, “আমরা আমাদের কর্তব্য পালন করেছি। এটা আমাদের দায়িত্ব ছিল।” এই রায় তদন্তকারী সংস্থাগুলির জন্য একটি গুরুতর প্রশ্ন চিহ্ন তৈরি করেছে এবং ভবিষ্যতে এমন মামলার তদন্ত পদ্ধতিতে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।