“র্যাগিং, যৌন হেনস্থা, হুমকি…”-সব জেনেও মনোজিৎকে ছাড় দিয়েছিল আইন কলেজের জিবি?

কসবার এক বেসরকারি আইন কলেজে ঘটে যাওয়া গণধর্ষণ কাণ্ডে অভিযুক্ত টিএমসিপি নেতা এবং কলেজের অস্থায়ী কর্মী মনোজিৎ মিশ্রকে দীর্ঘ দিন ধরে কলেজের গভর্নিং বডি (GB) কীভাবে সুরক্ষা ও প্রশ্রয় দিয়েছে, তা নিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্তকারী দলের রিপোর্টে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। একই সঙ্গে, হাইকোর্ট নিযুক্ত কমিটিকে দেওয়া ইডি-র রিপোর্ট নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে উচ্চ আদালত, যা সামগ্রিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্তকারী দলের কাছে কসবার ওই আইন কলেজ প্রায় ৫০০ পাতার একটি রিপোর্ট জমা দিয়েছে, যেখানে GB-র বিভিন্ন রেজোলিউশনও অন্তর্ভুক্ত আছে। এই নথি পরীক্ষা করে তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন যে, মনোজিৎ এবং তার ‘গ্যাং’-এর বিরুদ্ধে র্যাগিং, যৌন হেনস্থা, শারীরিক নিগ্রহ, হুমকি সহ একাধিক গুরুতর অভিযোগ জমা পড়লেও GB একটি অভিযোগেও ন্যূনতম পদক্ষেপ করেনি। অভিযোগগুলো যতবারই GB-র সামনে আলোচনার জন্য এসেছে, ততবারই সেগুলোকে ‘ডেফার্ড’ বা ‘পরে আলোচনা করা হবে’ বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেই ‘পরে’ আর কখনোই আসেনি। তদন্তকারীদের অভিযোগ, এভাবেই মনোজিৎকে আশ্রয় দিয়ে এসেছে GB।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্তা জানিয়েছেন, “ওই GB-র মেয়াদ এমনিতেই উত্তীর্ণ হয়েছে। ২০১৭ সালে ওই আইন কলেজের GB তৈরি হয়। এত দিন একটা GB-র মেয়াদ চলতে পারে না।” এই বিষয়ে ইতিমধ্যেই কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল নয়না চট্টোপাধ্যায়কে প্রায় ৫ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্তকারীরা। GB-তে মনোনীত আরও এক সদস্যকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। সূত্র অনুযায়ী, GB কেন মনোজিৎকে দিনের পর দিন ছাড় দিয়ে রেখেছিল, এই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর মেলেনি এবং উভয়ই উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তবে তাঁদের লিখিত বক্তব্য এবং অন্যান্য নথি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
রাজ্য সরকারের মেয়াদ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত ঘিরে বিতর্ক:
এই পরিস্থিতিতে রাজ্য উচ্চশিক্ষা দফতর একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ৩০শে জুন যেসব কলেজের পরিচালন সমিতির মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছে, সেগুলিকে আরও ৬ মাসের জন্য ‘এক্সটেনশন’ বা মেয়াদ বৃদ্ধি করা হবে। কেন্দ্রীয় সরকারের গত ১২ এপ্রিলের একটি প্রেস নোট নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে, যেখানে রোজ় ভ্যালির বাজেয়াপ্ত টাকা অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি দিলীপ শেঠের হাতে তুলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যে শেঠ কমিটি নিয়ে হাইকোর্টে অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে।
প্রশ্ন উঠেছে, যেসব GB দিনের পর দিন মনোজিৎ-দের মতো ‘দাদা’-দের ‘সুরক্ষা’ দিয়ে এসেছে, সেখানে তাদের মেয়াদ আরও বাড়িয়ে দেওয়া কতটা নৈতিক? রাজ্য সরকার বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, ‘২০১৭-র কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী GB-র মেয়াদ বাড়াতে পারে উচ্চশিক্ষা দপ্তর।’
রাজনৈতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া:
বিরোধী অধ্যাপক সংগঠন ‘ওয়েবকুটা’-র সভাপতি শুভোদয় দাশগুপ্ত এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, “এটা তো একরকম ছলনা করা। আমরা জানি বিভিন্ন কলেজের GB-তে তৃণমূল ছাত্রনেতাদের প্রতিনিধি করে রেখেছে উচ্চশিক্ষা সংসদই। এই অবস্থায় উচিত ছিল GB-গুলির পুনর্মূল্যায়ন করে এই ধরনের সমস্যাজনক ব্যক্তিদের বের করে ফ্রেশ GB গঠন করা।” তিনি আরও বলেন, “তা না করে সরকার আসলে এই সব প্রশ্রয়দাতাদেরই মেয়াদ বাড়িয়ে তাদের আরও শক্তিশালী করল।”
অন্যদিকে, শাসকদলের অধ্যাপক সংগঠন ‘ওয়েবকুপা’-র রাজ্য কমিটির সদস্য তথা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মনোজিৎ মণ্ডলের দাবি, “GB পুনর্গঠন করা সময়সাপেক্ষ কাজ। এ ব্যাপারে অধ্যাপক সংগঠনগুলির ভূমিকাও যথেষ্ট। সেটা সরকার নিশ্চিত ভাবেই করবে।” তবে তিনি একই সঙ্গে মনে করেন, “GB-তে শিক্ষানুরাগীদের রাখাই শ্রেয়। ছাত্রছাত্রীদের মনোনীত করলে নানা অভিযোগ সামনে আসতে পারে।”
কসবা আইন কলেজের ঘটনা এবং এর পরবর্তী এই প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত রাজ্যের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।