বিশেষ: আকাশ ও আকাশ-প্রাইম এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের মধ্যে পার্থক্য কী? কি বলছে বিশেষজ্ঞরা?

ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা (DRDO) দ্বারা নির্মিত অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ‘আকাশ’-এর নতুন সংস্করণ ‘আকাশ-প্রাইম’ লাদাখ সেক্টরে ১৫,০০০ ফুটেরও বেশি উচ্চতায় সফলভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর এয়ার ডিফেন্স ইউনিট এবং ডিআরডিও-র ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে এই পরীক্ষাটি সম্পন্ন হয়, যা ভারতের আত্মনির্ভর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার এক নতুন মাইলফলক। এই সফল পরীক্ষা আকাশ-প্রাইমের উন্নত ক্ষমতা এবং প্রতিকূল আবহাওয়ায় এর নির্ভুল কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে।
আকাশ মিসাইল: ভারতের প্রথম দেশীয় SAM
আকাশ মিসাইল হল ভারতের প্রথম দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি মাঝারি-পাল্লার ভূমি থেকে আকাশ (SAM) ক্ষেপণাস্ত্র। ১৯৮০-র দশকে ডিআরডিও এর নির্মাণ কাজ শুরু করে এবং ২০১৪ সালে ভারতীয় বিমান বাহিনী ও ২০১৫ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনী এটিকে তাদের বহরে যুক্ত করে।
- পাল্লা: ২৭-৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত শত্রু বিমান, ড্রোন এবং ক্রুজ মিসাইলকে লক্ষ্যবস্তু করতে সক্ষম।
- উচ্চতা: ১৮ কিলোমিটার পর্যন্ত উড়তে পারে।
- গতি: প্রায় ৩০০০ কিমি/ঘণ্টা বেগে ধাবিত হয়।
- গাইডেন্স: রাজেন্দ্র রাডারের সাহায্যে লক্ষ্যবস্তু ট্র্যাক করার জন্য কমান্ড গাইডেন্স সিস্টেম ব্যবহার করে।
- ওজন ও ওয়ারহেড: ৭২০ কেজি ওজনের এই ক্ষেপণাস্ত্রে ৬০ কেজি বিস্ফোরক ওয়ারহেড থাকে।
- বিশেষত্ব: এটি একইসাথে একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে এবং একটি মোবাইল প্ল্যাটফর্ম থেকে উৎক্ষেপণ করা যায়। ২০২০ সালে ভারত-চীন সীমান্ত উত্তেজনা এবং ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর সময় পাকিস্তানি বিমান হামলা ব্যর্থ করে আকাশ তার কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে।
আকাশ-প্রাইম: উন্নত প্রযুক্তি ও নির্ভুলতার প্রতীক
আকাশ-প্রাইম হল আকাশের একটি উন্নত সংস্করণ, যা ২০২১ সালে প্রথম পরীক্ষা করা হয়। এটি বিশেষত উচ্চ এবং অত্যন্ত ঠান্ডা অঞ্চলে (যেমন লাদাখ) ব্যবহারের জন্য ডিজাইন করা হয়েছে।
- রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি সিকার (আরএফ সিকার): আকাশ-প্রাইমে একটি দেশীয় অ্যাক্টিভ আরএফ সিকার যুক্ত করা হয়েছে, যা লক্ষ্যবস্তুতে আরও নির্ভুলভাবে আঘাত হানতে সাহায্য করে। আকাশের পূর্ববর্তী সংস্করণে এই বৈশিষ্ট্যটি ছিল না।
- কর্মক্ষমতা: এটি ৪৫০০ মিটার উচ্চতা এবং চরম ঠান্ডাতেও অত্যন্ত কার্যকর। গত বুধবার লাদাখে এর সফল পরীক্ষা চলাকালীন এটি দুটি দ্রুতগতির ড্রোনকে নির্ভুলভাবে ধ্বংস করে তার সক্ষমতা প্রমাণ করে।
- পাল্লা ও উচ্চতা: আকাশের মতোই আকাশ-প্রাইমের পাল্লা ২৫-৩০ কিলোমিটার এবং এটি ১৮ কিলোমিটার পর্যন্ত উচ্চতায় উঠতে পারে।
- ডিজাইন: আকাশ-প্রাইমের গ্রাউন্ড সিস্টেম আপগ্রেড করা হয়েছে, যা এটিকে সমস্ত আবহাওয়ায় নির্ভরযোগ্য করে তোলে।
- ব্যবহার: লাদাখের মতো সংবেদনশীল এলাকায় বিমান হুমকি (যেমন ড্রোন, যুদ্ধবিমান) থেকে সুরক্ষার জন্য এটি বিশেষভাবে উপযোগী।
ভবিষ্যতের পথ: আকাশ-এনজি
আকাশ মিসাইল ইতিমধ্যেই ভারতের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মেরুদণ্ড হিসেবে তার ক্ষমতা দেখিয়েছে। তবে আকাশ-প্রাইম এটিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছে। আরএফ সিকার এবং উচ্চ উচ্চতায় কাজ করার ক্ষমতা এটিকে শত্রুর নতুন নতুন অস্ত্রের (যেমন চীনা ড্রোন) বিরুদ্ধে অত্যন্ত কার্যকর করে তোলে। লাদাখের মতো অঞ্চলে, যেখানে অক্সিজেনের মাত্রা কম এবং তাপমাত্রা অত্যন্ত শীতল, সেখানে আকাশ-প্রাইমের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।
আকাশ-প্রাইমকে আরও উন্নত করার কাজ চলছে। এর পরবর্তী পদক্ষেপ হবে ‘আকাশ-এনজি’ (নিউ জেনারেশন), যার পাল্লা ৭০-৮০ কিলোমিটার পর্যন্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই ধারাবাহিক উন্নয়ন ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। আকাশ এবং আকাশ-প্রাইম উভয়ই ভারতের প্রতিরক্ষায় অপরিহার্য, তবে নতুন প্রযুক্তি এবং নির্ভুলতার ক্ষেত্রে আকাশ-প্রাইম নিঃসন্দেহে এক ধাপ এগিয়ে।