অপেক্ষার অবসান! ফরাক্কা-বৈষ্ণবনগর দ্বিতীয় গঙ্গা সেতু চালু হচ্ছে অগস্টেই

উত্তরবঙ্গ এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে দেশের বাকি অংশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন হতে চলেছে। সবকিছু ঠিক থাকলে, আগামী আগস্ট মাসের শেষেই চালু হতে চলেছে বহু প্রতীক্ষিত বৈষ্ণবনগর-ফরাক্কা সংযোগকারী গঙ্গার দ্বিতীয় সেতু। প্রাথমিকভাবে দুটি লেনে যানবাহন চলাচল শুরু হলেও, পরবর্তীতে চার লেনের এই সুবিশাল সেতুটি পুরোপুরি খুলে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন সেতু নির্মাণকারী সংস্থার আধিকারিকরা। এই সেতু চালু হলে ফরাক্কা ব্যারেজ সংলগ্ন পুরনো সেতুটির উপর যানবাহনের চাপ কমার পাশাপাশি অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও গতি আসবে।
ফরাক্কা: এক দশকের অপেক্ষার অবসান:
১৯৭২ সালে চালু হওয়া ফরাক্কা ব্যারেজ সংলগ্ন পুরনো সেতুটির উপর যানবাহনের চাপ ক্রমাগত বাড়ছিল, যা সেতুর স্বাস্থ্যকেও দুর্বল করে দিচ্ছিল। এই পরিস্থিতি উপলব্ধি করে প্রায় দুই দশক আগেই আরও একটি সেতুর প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। দীর্ঘ টানাপোড়েন এবং আলোচনার পর অবশেষে ২০১৮ সালে প্রথম সেতুর অদূরেই দ্বিতীয় সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে লক্ষ্য ছিল ২০২২ সালের মধ্যেই কাজ শেষ করে সেতু চালু করা।
বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে আলোর দিশা:
সেতুর কাজ শুরু হয়েছিল দক্ষিণ ভারতের একটি নির্মাণ সংস্থার সঙ্গে চীনের একটি সংস্থার মেলবন্ধনে। তবে শুরুতেই ঘটে এক মর্মান্তিক বিপর্যয়। বৈষ্ণবনগরের দিকে এক দুর্ঘটনায় কয়েকজন শ্রমিক ও আধিকারিকের মৃত্যু হয়, যার ফলে কাজ কিছুটা থমকে যায়। এরপর বিশ্বজুড়ে হানা দেয় করোনাভাইরাস মহামারী, যার কারণে নির্মাণ কাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। করোনাকাল কাটার সাথে সাথে চীনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কে দূরত্ব বাড়তে শুরু করে, ফলস্বরূপ চীনা নির্মাণকারী সংস্থা এই প্রকল্প থেকে হাত গুটিয়ে নেয়। সকল বাধা কাটিয়ে অবশেষে দক্ষিণ ভারতের আরকেইসি (RKEC) নামে ভারতীয় সংস্থাটি একাই সেতুর কাজ শুরু করে এবং এখন সেই কাজ শেষ পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে।
আধুনিক স্থাপত্য ও নিরাপত্তার বুনিয়াদ:
গঙ্গার উপর নির্মীয়মাণ এই সেতুটির দু’পাশের অ্যাপ্রোচ রোড-সহ মোট দৈর্ঘ্য ৫.৪৬৮ কিলোমিটার, যার মধ্যে গঙ্গার উপর সেতু রয়েছে ২.৫৮ কিলোমিটার। চার লেনের এই সেতুতে প্রতি দুটি লেনের জন্য ৪২টি করে পিলার রয়েছে এবং চারটি পার্কিং জোনও তৈরি করা হয়েছে। সেতুতে আধুনিক মানের কংক্রিটের ঢালাই ব্যবহার করা হয়েছে এবং বল-বিয়ারিং পদ্ধতিতে সেতুর উপরের অংশ তৈরি করা হয়েছে, যা এর স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। পুরো সেতু জুড়ে থাকছে আধুনিক আলো এবং নিরাপত্তার কারণে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা। উল্লেখ্য, এই সেতু থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরেই বাংলাদেশ অবস্থিত, তাই নিরাপত্তার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেতুর দু’দিকের অ্যাপ্রোচ রোড ইতিমধ্যেই তৈরি হয়ে গিয়েছে এবং বর্তমানে সেতুতে রং আর আলো লাগানোর কাজ দ্রুতগতিতে চলছে।
দ্রুত উদ্বোধনের অঙ্গীকার:
নির্মাণকারী সংস্থার সিভিল সাইট ইঞ্জিনিয়ার ইসরাইল শেখ জানিয়েছেন, “এখন ব্রিজের দু’পাশে ডিভাইডারে রং করার কাজ চলছে। কিছু আলো লাগানোর কাজ বাকি। দ্রুতগতিতে কাজ চলছে। আগস্টের মধ্যেই সমস্ত কাজ শেষ করার নির্দেশিকা এসেছে।” প্রজেক্ট ম্যানেজার ভেঙ্কটেশস্বামী রাও আরও জানান, “আগস্টের শেষে নতুন এই সেতুর একদিকের দুটি লেন খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ওই দুটি লেনের কাজ প্রায় শেষ। শুধু রং আর আলোর কাজ কিছু বাকি রয়েছে। আশা করছি, দু’মাসের মধ্যেই সেই কাজ শেষ হয়ে যাবে। কাজ শেষ হয়ে গেলে দেরি না-করে নতুন এই সেতু আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করে দেওয়া হবে।”
এই সেতু চালু হলে পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘদিনের এক স্বপ্ন পূরণ হবে এবং এটি অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।