বাম্পার ফলনেও সর্বনাশ! মাথায় হাত রাজ্যের হাজার হাজার চাষিদের, সরকার কি পদক্ষেপ করবে?

রাজ্য জুড়ে আলুর বাম্পার ফলন হলেও এবার তা কাল হয়েছে চাষিদের জন্য। বাজারে দাম তলানিতে ঠেকায় চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন রাজ্যের হাজার হাজার আলু চাষি। কোল্ড স্টোরে রাখা আলু বস্তা প্রতি মাত্র ৩০০-৩২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা কেজি প্রতি ৬-৭ টাকার সমান। অথচ, খোলা বাজারে সেই আলুই বিক্রি হচ্ছে ১৮ থেকে ২০ টাকা কেজি দরে। ফলে, লাভের কথা দূরে থাক, চাষিদের উৎপাদন খরচও উঠছে না।

চাষিদের আর্তনাদ: “মাঠেই বেচে দিলেই ভালো হতো”
চাষিরা বলছেন, যখন আলু মাঠ থেকে তোলা হয়েছিল, তখনও দাম খুব বেশি ছিল না—প্রতি বস্তা ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করছিল। অনেক চাষিই ভেবেছিলেন, কোল্ড স্টোরে কিছুদিন রেখে পরে ভালো দামে বিক্রি করবেন। কিন্তু তাঁদের সেই আশা এখন নিরাশায় পরিণত হয়েছে। কোল্ড স্টোরে রাখা আলুর ‘ফ্রি বন্ড’ দাম বর্তমানে মাঠের দামের থেকেও কম, মাত্র ৩০০-৩৫০ টাকা বস্তা প্রতি। হতাশাগ্রস্ত চাষিরা আক্ষেপ করে বলছেন, “এর থেকে মাঠেই যদি বিক্রি করতাম, তবুও কিছুটা লাভ হতো।”

ধান চাষের প্রস্তুতিতে অর্থ সংকট
এ সময়ে বহু চাষিরই ধান চাষের প্রস্তুতির জন্য টাকার প্রয়োজন হয়। এই খরচ মেটাতেই তাঁরা কোল্ড স্টোর থেকে আলু বের করে বিক্রি করেন। কিন্তু বর্তমান বাজার দরে তাঁরা কার্যত অর্থ সংকটে পড়েছেন। অনেক চাষি বলছেন, “আমরা তো নভেম্বর-ডিসেম্বর পর্যন্ত আলু ধরে রাখতে পারি না। ধান চাষের জন্য টাকা দরকার হয়, তাই এখনই বিক্রি করতে হচ্ছে, আর সেই বিক্রিতেই সর্বনাশ হচ্ছে।”

ব্যবসায়ীদের লাভ, চাষিদের লোকসান: কোথায় গায়েব হচ্ছে মাঝের টাকা?
শহরের খোলা বাজারে যখন আলুর দাম ১৮ থেকে ২০ টাকা প্রতি কেজি, সেই দাম কিন্তু চাষিরা পাচ্ছেন না। তাঁদের প্রশ্ন, “আমরা ৭ টাকায় বিক্রি করছি, অথচ বাজারে ২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, এটা কীভাবে সম্ভব?” মাঝখান থেকে মোটা অঙ্কের লাভ করে নিচ্ছেন এক শ্রেণির ব্যবসায়ী।

আলু ব্যবসায়ী ও টাস্ক ফোর্স কী বলছে?
হুগলির তারকেশ্বরের আলু ব্যবসায়ী প্রভাত রং জানিয়েছেন, “এখনও প্রায় ৭৫ শতাংশ আলু কোল্ড স্টোরে রয়ে গেছে। মাত্র ২৫ শতাংশ আলু বাজারে এসেছে। ফলে দাম আরও কমবে না বাড়বে—এটা এখনই বলা কঠিন। তবে অন্য রাজ্যে আলু পাঠানো গেলে দাম কিছুটা বাড়তে পারে।”

রাজ্য টাস্ক ফোর্সের সদস্য রবীন্দ্রনাথ কোলে স্বীকার করেছেন, “আলুর দাম পড়েছে, চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সরকারের কাছে খবর গিয়েছে। আমরা দফতরের আধিকারিকদের সঙ্গে কথা বলব, তারা মুখ্যমন্ত্রী ও মুখ্যসচিবকে জানাবেন। এবার আলুর ফলন ভালো হয়েছে, বেশিটাই এখনও কোল্ড স্টোরে। ফলে বাজারে চাহিদা কম, আর তাই দামও নিচে। তবে সরকার নিশ্চয় কোনো পদক্ষেপ নেবে।”

সরকারের হস্তক্ষেপের দাবি
বর্তমান পরিস্থিতিতে চাষিরা সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপের দাবি জানাচ্ছেন। তাঁদের বক্তব্য, “যদি এখনও পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে এই বছর আলু চাষ করে অনেকেই সর্বস্বান্ত হবেন।” চাষিরা সরকারকে চাহিদা অনুযায়ী অন্য রাজ্যে আলু রপ্তানির ব্যবস্থা করার অথবা ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (Minimum Support Price – MSP) ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন।

রাজ্যের খাদ্য ভাণ্ডারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী আলু চাষিরা এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে।