ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন অধরা, তবুও বাইশ গজে প্রত্যাবর্তন, বাংলার রাহুল রায় এখন জাতীয় পর্যায়ের আম্পায়ার

অর্থাভাবের কারণে ছেলেবেলায় ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ না হলেও, ক্রিকেটের প্রতি অদম্য ভালোবাসা বেলুড়ের রাহুল রায়কে নিয়ে এলো জাতীয় পর্যায়ের আম্পায়ারের স্বীকৃতি। সাত বছর পর বাংলা একজন নতুন জাতীয় পর্যায়ের আম্পায়ার পেল, যিনি পেশায় একজন ইঞ্জিনিয়ার এবং বর্তমানে সেন্ট্রাল এক্সাইজে কর্মরত।
ক্রিকেটের প্রতি তাঁর টান বহু পুরনো। নিজে খেলোয়াড় হতে না পারলেও, রাহুল সেই ইচ্ছেটাকে মনের গভীরে সযত্নে লালন করেছিলেন। কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করে আইবিএম-এ তিন বছর চাকরি করার পর এসএসসি-র মাধ্যমে সেন্ট্রাল এক্সাইজে নিয়োগ পান রাহুল। আর এখানেই তাঁর অবদমিত স্বপ্ন ডানা মেলতে শুরু করে, যার পেছনে মূল প্রেরণা ছিলেন আরেক আম্পায়ার অভিজিৎ ভট্টাচার্য, যিনি চলতি বছর আইপিএলে ম্যাচ অফিসিয়ালের দায়িত্ব পালন করেছেন।
বেলুড়ের রাহুল রায় অভিজিৎ ভট্টাচার্যকেই তাঁর মেন্টর মানেন। বোর্ড আম্পায়ার হওয়ার জার্নি নিয়ে বলতে গিয়ে সেন্ট্রাল এক্সাইজের এই ইন্সপেক্টর ছিলেন অনর্গল। রাহুল বলেন, “ক্রিকেট ভালোবাসি ছোট থেকেই। আম্পায়ারিং আমার নেশা। নিজে খেলিনি, তবু ক্রিকেটের প্রতি টান চিরকালের। আইবিএম-এ চাকরি করেছি তিন বছর। ২০১৭ সালে স্টাফ সিলেকশন কমিশনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সেন্ট্রাল এক্সাইজে যোগদান করি। সেখানে অভিজিৎ ভট্টাচার্যের অধীনে রয়েছি।”
রাহুল সিএবি প্রেসিডেন্ট স্নেহাশিস গঙ্গোপাধ্যায়, সঞ্জয় দাস এবং আম্পায়ার্স কমিটির চেয়ারম্যান প্রসেনজিৎ (বালু) বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিও তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি জানান, “বোর্ডের আম্পায়ারদের পরীক্ষার কথা জানার পরই তাতে বসার ইচ্ছে জেগেছিল। সিএবি’র আম্পায়ার্স কমিটির চেয়ারম্যান প্রসেনজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়কে কথাটা জানিয়েছিলাম। সিএবি প্রেসিডেন্ট স্নেহাশিস গঙ্গোপাধ্যায়, অন্যতম কর্তা সঞ্জয় দাস ও প্রসেনজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে নীতিন মেননকে দিয়ে একটি ওয়ার্কশপ করায় সিএবি। সেই ওয়ার্কশপে যোগ দিয়েছিলাম। তারপরই বোর্ডের পরীক্ষায় বসেছিলাম।” সর্বভারতীয় স্তরে ১৫২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে বাংলা থেকে মাত্র চারজন পৌঁছেছিলেন, যার মধ্যে সোহম চৌধুরী, অভিষেক হালদার, বিউটি চক্রবর্তীকে টেক্কা দিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন রাহুল রায়।
বোর্ডের স্বীকৃত এই আম্পায়ার আরও জানান, ২০১৮ সালে ডিপার্টমেন্টের ঊর্ধ্বতন আধিকারিক অভিজিৎ দা-ই এসে জানিয়েছিলেন যে সিএবি আম্পায়ার নেবে। আগ্রহী হলে পরীক্ষা দেওয়ার কথা জানান তিনি এবং সেই সুযোগও করে দেন অভিজিৎ ভট্টাচার্য। সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েই আম্পায়ার হন রাহুল। প্রোবেশনাল থেকে তিনি এখন গ্রেড থ্রি আম্পায়ার। গত মরশুমে সিএবি আয়োজিত স্থানীয় ক্রিকেটের প্রথম ডিভিশনের ছ’টি ম্যাচ খেলিয়েছেন তেত্রিশ বছর বয়সী রাহুল। এছাড়া, মেয়র্স কাপের সেমিফাইনাল এবং দ্বিতীয় ডিভিশনে প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালও পরিচালনা করেছেন তিনি।
কেন্দ্রীয় সরকারি চাকরিজীবী হওয়ায় এবার আম্পায়ারিংয়ের জন্য তাঁর ছুটি বরাদ্দ হবে। আগে চাকরি সামলে সময় পেলেই কেবল ম্যাচ পরিচালনার সুযোগ মিলত। এই সুযোগের জন্য রাহুল অবশ্য প্রসেনজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়কে কৃতিত্ব দিতে চান। খুশির দিনে অকপট রাহুল জানালেন, “বালু দা আমাদের মতো আম্পায়ারদের সামগ্রিক ছবিটা বদলে দিয়েছেন।” ঘরোয়া থেকে জাতীয় মঞ্চে পা রেখে তাঁর লক্ষ্য কী, জানতে চাইলে রাহুলের স্পষ্ট উত্তর, “অভিজিৎ দা’র মতো হওয়া।” ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ না হলেও, বাইশ গজের সঙ্গে জুড়ে থাকার এই অদম্য স্পৃহা রাহুল রায়কে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেল।