“চাকরি ছেড়ে চলে আয়”-ড্রিমলাইনার ক্রাশ নিয়ে পরিবারকে তাড়া করছে সেই দুঃস্বপ্নই

আমেদাবাদ বিমান দুর্ঘটনার ছায়া: অবসাদে ভুগছেন পাইলট-এয়ারহোস্টেসরা, বাড়ছে ‘সিক রিপোর্ট’
নয়াদিল্লি/মুম্বাই, ২রা জুলাই, ২০২৫: ১২ই জুন আমেদাবাদে এয়ার ইন্ডিয়ার ড্রিমলাইনার ভেঙে পড়ার মর্মান্তিক ঘটনায় ২৪১ জন যাত্রীর সাথে ১০ জন কেবিন ক্রু এবং ২ জন পাইলট প্রাণ হারানোর পর থেকে ভারতীয় বিমান শিল্পের পাইলট ও এয়ারহোস্টেসদের মধ্যে এক অবর্ণনীয় মানসিক চাপ তৈরি হয়েছে। কর্মীরা বলছেন, ক্লান্তি, অস্বস্তি এবং স্বজন হারানোর শোক তাদের গ্রাস করেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে তাদের কর্মজীবনে। অনেকেই ‘স্বেচ্ছামূলক অবসর’ (VRS) নেওয়ার কথা ভাবছেন।

মানসিক চাপ ও তার লক্ষণ:

একজন সিনিয়র এয়ারহোস্টেসের কন্ঠে ভেসে আসে ক্লান্তি। তিনি বলেন, “এখনও রাতে ভালো করে ঘুম হচ্ছে না। মর্নিং ফ্লাইটে টায়ার্ড লাগছে। একটা অদ্ভুত অস্বস্তি নিয়ে প্রতিটা ফ্লাইটে উঠছি। যন্ত্রের মতো কাজ করে যাচ্ছি। মানসিক অশান্তিটা কিছুতেই ঠেলে ফেলে দিতে পারছি না।” দুর্ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পরেই, ১২ই জুন রাতে এয়ার ইন্ডিয়ার ২২১ জন কেবিন ক্রু ‘সিক রিপোর্ট’ (অসুস্থতার কথা জানিয়ে) করেছিলেন, যা এই মানসিক চাপের ভয়াবহতা প্রমাণ করে। তারা সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর পাহাড়-প্রমাণ মানসিক চাপ নিয়ে ফ্লাই করতে চাননি।

অন্য একজন এয়ারহোস্টেসের কথায়, “সেদিন যে ১০ জন মারা গিয়েছিলেন, তাদের কয়েকজনের সঙ্গে কখনও না কখনও উড়েছি। কোনো স্টেশনে গিয়ে তিন-চার দিন একসঙ্গে থেকেছি। কেউ বন্ধুর মতো, কেউ বড় দিদির মতো। স্বজন ছেড়ে বাইরে গিয়ে পরিবারের মতো থাকি আমরা। সেই স্বজনহারার শোক তো আমাদেরও ঘিরে ধরেছে।”

কর্মীদের ‘দেখভাল’ করার সুনাম রয়েছে টাটা গোষ্ঠীর। কর্তারাও জানেন ১২ই জুনের ঘটনার পর থেকে পাইলট ও কেবিন-ক্রুদের মধ্যে একটি অমানবিক মানসিক চাপ তৈরি হয়েছে। এই মানসিক চাপ কমাতে তাই দিল্লি ও মুম্বাইতে আলাদা করে কাউন্সেলিং সেশন শুরু করেছে সংস্থা। কর্মীরা চাইলে সশরীরে গিয়ে কাউন্সিলরদের সঙ্গে কথা বলতে পারবেন, অথবা ফোন বা ভিডিও কলেও কনসালটেশন নিতে পারবেন।

কিন্তু কর্মীদের মধ্যে রয়েছে এক অদ্ভুত ভয়। পাইলট ও বিমানসেবিকাদের বেতনের বড় অংশই আসে ‘ফ্লাইং অ্যালাওয়েন্স’ (উড়ান ভাতা) থেকে। তারা মনে করছেন, “কোম্পানি যখন জানতে পারবে, মানসিক চাপ বেড়েছে, ফ্লাই করতে দেবে না। তখন?” এই আশঙ্কায় অনেকে খোলাখুলি কাউন্সেলিং সেশনে যেতে চাইছেন না। তাই অনেকেই বাড়িতে মেডিটেশন শুরু করেছেন, কেউ ব্যক্তিগত স্তরে সাইকিয়াট্রিস্ট বা সাইকোলজিস্ট দেখাচ্ছেন, আবার কেউ কেউ অ্যাংজ়াইটি কমাতে ওষুধও খাচ্ছেন।

একজন সিনিয়র পাইলট বলছেন, “আমরা চেক-লিস্ট মেনেই জীবনযাপন করি। অনেক রেস্ট্রিকশন। আমরা প্রফেশনাল। ঘটনার পরে ককপিটে গিয়ে যখন বসেছি, বা এখনও যে বসছি, চোখের সামনে এক ঝলক উঁকি দিয়ে যাচ্ছে ধ্বংসস্তূপের ছবি। কিন্তু, পরমুহূর্তেই কনসেনট্রেট করছি চেক-লিস্টে। আরও সতর্ক হয়ে খুঁটিয়ে দেখে নিচ্ছি সবকিছু। কিছু ভাবার অবকাশ নেই। এতগুলো মানুষের জীবন আমাদের হাতে। শুধু অবসরে, একা থাকার সময়ে একটা ক্লান্তি এসে গ্রাস করছে।”

তিনি আরও বলেন, ১২ই জুনের ঘটনা তাদের থেকে কেবিন ক্রুদের উপর বেশি দাগ কেটেছে। তাদের মধ্যে একটি ‘ইনসিকিউরিটি’ কাজ করছে। এক এয়ারহোস্টেস বলেন, “প্রতিটি টেক-অফের পরে ১০ হাজার ফুট পর্যন্ত আমরাও সিট বেল্ট পরে বসে নিজেদের মধ্যে নানা কথা বলি। ১২ই জুনই ইভনিং ফ্লাইট ছিল। সিট-বেল্ট পরে আমরা চুপ করে বসেছিলাম। কেউ একটাও কথা বলিনি। দেখলাম, সামনে বসা প্যাসেঞ্জাররা আমাদের মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন। সেদিনের সেই দৃষ্টি কখনই ভুলব না। এতটা অসহায়তা কখনও প্যাসেঞ্জারদের চোখে দেখিনি।”

পাইলটরা মেনে নিচ্ছেন, এই ঘটনা তাদের আত্মবিশ্বাসে ভয়ঙ্কর আঘাত হেনেছে। ড্রিমলাইনারের মতো ‘অজেয়’ বিমান এভাবে ভেঙে পড়া তারা মেনে নিতে পারছেন না। প্রথম দু’দিন ড্রিমলাইনারের প্রায় কোনো পাইলটই ঘুমাননি। নিজেদের মধ্যে চ্যাট করেছেন, কারণ একটা ‘সেন্স অফ হেল্পলেসনেস’ তাদের গ্রাস করেছে।

১১ই জুলাই দুর্ঘটনার রহস্যভেদ?

যদিও পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে। একজন পাইলটের কথায়, “মানুষ এখন খুব তাড়াতাড়ি সবকিছু ভুলে যেতে শিখেছে। মনে আছে প্রায় ২০ বছর আগে পাটনা এয়ার ক্র্যাশের পরে বেশ কিছুদিন ওই রুটে আমরা প্যাসেঞ্জারই পাইনি। খোঁজ নিয়ে দেখুন, এখন আমেদাবাদ-গ্যাটউইক রুটের ফ্লাইটও ফুল যাচ্ছে।”

কিন্তু এই ঘটনার মানসিক রেশ থেকে বেরিয়ে আসতে কর্মীদের সময় লাগবে, এবং এয়ার ইন্ডিয়াকে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে, এটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।