‘নেপো কিড’ তকমা সত্ত্বেও বলিউডে মসৃণ নয় তারকা সন্তানদের পথচলা, শানায়া, করিনা, অভিষেক ও সারার অনাকাঙ্ক্ষিত যাত্রা!

ঝলমলে বলিউড। স্বপ্নপূরণের এই দুনিয়ায় প্রবেশ করতে চান অনেকেই। যারা এই জগতের বাইরের, তাদের কঠিন সংগ্রাম করে নিজেদের জায়গা তৈরি করতে হয়। কিন্তু যারা ‘স্টার কিড’ বা তারকা সন্তান, অনেকেই যাদের ‘নেপো কিড’ বলে তকমা দেন, তাদের কি আসলেই তেমন কোনো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয় না? মাথার ওপর ‘বড় ছাদ’ থাকলেই কি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির যাত্রাটা অনেক সহজ হয়ে যায়, নাকি প্রথম ব্রেক পাওয়ার পর বাকি রাস্তা মসৃণ হয়ে যায়—এই ধারণা কি সত্যি?

বলিউডের ভেতরে তাকালে দেখা যায়, এমন কিছু তারকা সন্তান আছেন, যাদের প্রথম ডেবিউ করতে গিয়েও পড়তে হয়েছে একাধিক বাধার মুখে। সফলভাবে লঞ্চিং প্ল্যানিং করা সত্ত্বেও সবকিছু ভেস্তে গেছে, কারোর সিনেমার শুটিং শুরুই হয়নি, আবার কারোর প্রথম সিনেমা হাতছাড়া হয়েছে। ‘লেগেসি’ থাকলেই যে সফলতা পা ছোঁবে, এমনটা নয়—আসলে সবকিছুর জন্য সঠিক সময়, সঠিক স্থান এবং কঠোর পরিশ্রমের ওপরই ভরসা করতে হয়।

শানায়া কাপুর: পিছিয়ে যাওয়া স্বপ্নের সূচনা

অনিল কাপুর-বনি কাপুরের ছোট ভাই সঞ্জয় কাপুর ও মাহিপ কাপুরের মেয়ে শানায়া কাপুর। তার ‘বেধড়ক’ সিনেমা দিয়ে বলিউডে আত্মপ্রকাশ করার কথা ছিল। করণ জোহরের ধরমা প্রযোজনা সংস্থার ব্যানারে ২০২২ সালে এই সিনেমার ঘোষণা করা হয়, এবং শানায়ার ডেবিউ নিয়ে বেশ শোরগোলও পড়ে। কিন্তু নির্মাতাদের কোনো প্রতিক্রিয়া ছাড়াই এই সিনেমার শুটিং বন্ধ হয়ে যায়।

এই ঘটনা শানায়ার ওপরও বড় প্রভাব ফেলেছিল। ‘ফ্যাবুলাস লাইভস অফ বলিউড ওয়াইভস’ শোয়ে শানায়ার মা মাহিপ এই বিষয়ে খোলাসা করেন। তিনি জানান, অতিমারি করোনার সময় শারীরিক ও আর্থিক সমস্যার সঙ্গে এই ঘটনা শানায়াকে মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছিল। এখানেই শেষ নয়, প্যান-ইন্ডিয়া ফিল্ম ‘বৃষভ’-এ দক্ষিণী তারকা মোহনলালের সঙ্গে তার অভিনয়ের কথা থাকলেও, সেই সিনেমাও পিছিয়ে যায়। তবে, দীর্ঘ অপেক্ষার পর চলতি বছর ১১ জুলাই শানায়া অবশেষে ‘আঁখো কি গুস্তাকিয়া’ সিনেমা দিয়ে বলিউডে আত্মপ্রকাশ করতে চলেছেন।

করিনা কাপুর খান: হাতছাড়া হওয়া ‘কহো না প্যায়ার হ্যায়’

বলিউডের অন্যতম শক্তিশালী অভিনেত্রী করিনা কাপুর খানের প্রথম সিনেমা হিসেবে ‘রিফিউজি’কে সবাই চেনেন। অভিষেক বচ্চনের বিপরীতে তার অভিষেক হয়। কিন্তু অনেকেই জানেন না, করিনার সিনে পর্দায় পা রাখার কথা ছিল হৃতিক রোশনের সঙ্গে, ‘কহো না প্যায়ার হ্যায়…’ (২০০০) সিনেমার মাধ্যমে। এমনকি, করিনাকে নিয়ে সিনেমার প্রি-প্রোডাকশনের কাজও শুরু হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কিছুদিন পরেই সিনেমাটি তার হাতছাড়া হয়। কারণ হিসেবে জানা যায়, মা ববিতার সঙ্গে পরিচালক রাকেশ রোশনের মতের অমিল হওয়ায় করিনা এই সিনেমা থেকে সরে আসেন, এবং নবাগতা আমিশা পাটেল সেই সুযোগ পান। ব্লকব্লাস্টার হয় হৃতিক-আমিশার এই সিনেমা, আর করিনার অভিষেক হয় জেপি দত্তা পরিচালিত ‘রিফিউজি’তে।

অভিষেক বচ্চন: প্রযোজকহীন প্রথম প্রকল্প

অমিতাভ বচ্চন ও জয়া বচ্চনের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও বলিউডে আত্মপ্রকাশে জুনিয়র বচ্চনকে বেশ বেগ পেতে হয়। জানা যায়, অভিষেকের প্রথম সিনেমা হওয়ার কথা ছিল রাকেশ ওমপ্রকাশ মেহরার পরিচালনায় ‘সমঝৌতা এক্সপ্রেস’। ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক নিয়ে এক ভিন্নধর্মী গল্প নিয়ে এই সিনেমা তৈরির কথা ছিল, যেখানে অনিল কাপুর, মনীষা কৈরালা ও রানি মুখোপাধ্যায়েরও অভিনয়ের কথা ছিল। কিন্তু প্রযোজক না পাওয়ার কারণে এই সিনেমার শুটিং শুরু হয়নি।

অভিষেক নিজেই একবার জানিয়েছিলেন, এই সিনেমার প্রযোজক পাওয়ার জন্য তিনিও অনেক চেষ্টা করেছেন কিন্তু কোনো প্রচেষ্টাই কাজে আসেনি। সৌভাগ্যবশত, ‘সমঝৌতা এক্সপ্রেস’-এ অভিষেকের লুক পছন্দ হয় পরিচালক জেপি দত্তার, যিনি তাকে ‘রিফিউজি’ সিনেমায় কাস্ট করেন। যদিও বক্সঅফিসে সেই ছবি খুব বেশি প্রভাব ফেলেনি।

সারা আলি খান: দেরিতে মুক্তি ও প্রাথমিক বিভ্রান্তি

সইফ আলি খান ও অমৃতা সিংয়ের মেয়ে সারা আলি খানের ক্ষেত্রেও ঘটেছে একই ঘটনা। ‘কেদারনাথ’ ও ‘সিম্বা’ সিনেমাকে সারার ডেবিউ বলা হয়। অথচ তার আগে সইফ অভিনীত ‘জওয়ানি জানেমন’ সিনেমায় মুখ্যচরিত্রে কাজ করার কথা ছিল সারার।

এক সাক্ষাৎকারে সইফ জানিয়েছেন, তিনি তার মেয়েকে পরামর্শ দিয়েছিলেন তার বয়সী কোনো অভিনেতা যেমন বরুণ ধাওয়ান বা রণবীর সিংয়ের সঙ্গে জুটি বেঁধে প্রথম সিনেমা করতে। এমনকী, সারার প্রথম সিনেমা ‘কেদারনাথ’-ও মুক্তি পেতে যথেষ্ট সময় নিয়েছে। কখনও প্রোডাকশন হাউসে সমস্যা, কখনও বা শুটিংয়ে নানা বাধা—সব মিলিয়ে তারকা সন্তান সারা আলি খানের বলিউডে আত্মপ্রকাশ খুব মসৃণ ছিল না।

এই তারকা সন্তানদের উদাহরণই প্রমাণ করে, শুধুমাত্র বংশপরিচয় বা ‘নেপোটিজম’ বলিউডে সফলতার একমাত্র চাবিকাঠি নয়। ভাগ্যের চাকা কখন কোনদিকে ঘুরবে, তা বলা কঠিন। সঠিক সময়, সঠিক সুযোগ এবং কঠোর পরিশ্রম—এই তিনের মেলবন্ধনেই তৈরি হয় দীর্ঘস্থায়ী সফলতা, যেখানে পারিবারিক ‘লেগেসি’ হয়তো শুধু একটি দরজা খুলে দিতে পারে, কিন্তু পথটা তৈরি করতে হয় নিজেকেই।