“আমি তখন ওই ঘরেই ছিলাম”-ভারত-পাক যুদ্ধ বিরতি নিয়ে ট্রাম্পের দাবি উড়িয়ে দিলেন জয়শঙ্কর

ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষবিরতির নেপথ্য নায়ক কে? এই প্রশ্নের উত্তরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন, তাঁর বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার হুঁশিয়ারিতেই নাকি দুই দেশ শান্তিচুক্তি করতে রাজি হয়েছিল। কিন্তু এবার সেই দাবিকে একপ্রকার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। নিউ ইয়র্কের সংবাদমাধ্যম ‘নিউজউইক’-কে দেওয়া এক বিস্ফোরক সাক্ষাৎকারে জয়শঙ্কর সটান জানিয়েছেন, “আমি তখন ওই ঘরেই ছিলাম।” তাঁর এই মন্তব্য ট্রাম্পের দাবিকে সরাসরি মিথ্যা প্রমাণ করেছে এবং সেদিন আসলে কী ঘটেছিল, তার এক সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে।
৯ই মে, তৎকালীন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে ফোন করেন। এর ঠিক পরের দিন, অর্থাৎ ১০ই মে বিকেলে ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষবিরতির ঘোষণা করে। তবে এই ঘোষণার আগেই ট্রাম্প নিজে এক রহস্যময় ভঙ্গিতে সংঘর্ষবিরতির কথা জানিয়ে দেন, যা নিয়ে বিশ্বজুড়ে হইচই পড়ে গিয়েছিল।
জয়শঙ্করের কথায়, সেদিনের আলোচনায় সংঘর্ষবিরতি বা ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে কোনো কথাই হয়নি। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স যখন মোদীর সঙ্গে ফোনে কথা বলছিলেন, আমি তখন ওই ঘরেই ছিলাম। তিনি বলেছিলেন, ‘পাকিস্তান বড়সড় হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে… আমরা কিছু বিষয় মানছি না।’ প্রধানমন্ত্রী মোদী নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে সব কথা শুনছিলেন। এক সময় তিনিও জানিয়ে দিয়েছিলেন, পাকিস্তান হামলা চালালে ভারতও পাল্টা আঘাত হানবে।”
জয়শঙ্কর আরও জানান, ৯ই মে রাতে পাকিস্তান আসলেই বড়সড় হামলা চালিয়েছিল। ভারতও দ্রুত পাল্টা আঘাত হানতে শুরু করে। এরপরের দিন, অর্থাৎ ১০ই মে সকালে মার্কিন বিদেশমন্ত্রী মার্কো রুবিও-র সঙ্গে কথা হয় জয়শঙ্করের। বিদেশমন্ত্রীর কথায়, “তখনই রুবিও বলেছিলেন, ‘পাকিস্তান এখন আলোচনার জন্য প্রস্তুত’।”
এর কয়েক ঘণ্টা পরেই বিকেলে পাকিস্তানের ডিরেক্টর জেনারেল অফ মিলিটারি অপারেশনস মেজর জেনারেল কাশিফ আবদুল্লাহ ভারতের লেফটেন্যান্ট জেনারেল রাজীব ঘাইকে ফোন করে সংঘর্ষবিরতির অনুরোধ জানান। জয়শঙ্কর এরপর মুচকি হেসে কটাক্ষের সুরে বলেন, “আমি শুধু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি সেদিন ঠিক কী ঘটেছিল।” তাঁর এই মন্তব্য স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে, ট্রাম্পের দাবি আসলে ভুল, বরং পাকিস্তানের ওপর ভারতের পাল্টা আঘাতের চাপেই তারা শান্তি চেয়েছিল।
সাক্ষাৎকারে জয়শঙ্কর পহেলগাঁও হামলার মতো জঙ্গি আক্রমণকে কেবল সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ হিসেবে দেখেননি, বরং এটিকে ‘আর্থিক যুদ্ধ’ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর কথায়, “পাকিস্তান চেয়েছিল, কাশ্মীরের পর্যটন ধ্বংস হয়ে যাক। সঙ্গে ধর্মীয় হিংসা উস্কে দেওয়ার চেষ্টাও করেছিল ওরা। কারণ ধর্ম জেনেই খুন করা হয়েছিল পর্যটকদের।”
জয়শঙ্কর প্রথম নন, সংঘর্ষবিরতি নিয়ে ট্রাম্পের এই দাবি এর আগেও একাধিকবার অস্বীকার করেছে ভারত। কিন্তু তার পরেও ট্রাম্প নিজের দাবিতে অনড়। গত বুধবার হেগে এক সাংবাদিক সম্মেলনেও একই দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেছেন, “আমি ওদের বলেছিলাম, দেখুন, আপনারা যদি একে অন্যের সঙ্গে লড়াই করতে চান, তাহলে আমি কোনও বাণিজ্য চুক্তি করব না।”
তবে, ভারত তার নিজস্ব অবস্থানে অটল। জয়শঙ্করের মতো প্রভাবশালী মন্ত্রীর সরাসরি সাক্ষী দেওয়া ঘটনাপ্রবাহ বুঝিয়ে দিচ্ছে, ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষবিরতির পেছনের গল্প, ট্রাম্পের দাবির চেয়ে অনেক বেশি বাস্তব এবং ভিন্ন।