দক্ষিণ কলকাতা ল কলেজে গণধর্ষণ, ‘পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের’ ইঙ্গিত, পুলিশ হেফাজেতে ৪ অভিযুক্ত, রাজ্যজুড়ে প্রতিবাদের ঝড়!

দক্ষিণ কলকাতা ল কলেজে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক গণধর্ষণ মামলায় তদন্ত নতুন ও চাঞ্চল্যকর মোড় নিয়েছে। কলকাতা পুলিশের প্রধান প্রসিকিউটর সৌরিন ঘোষাল মঙ্গলবার জানিয়েছেন, মেডিক্যাল প্রমাণ, পরিস্থিতিগত প্রমাণ এবং ইলেকট্রনিক প্রমাণ ছাড়াও গত চার দিনের পুলিশ হেফাজতের সময় নির্যাতিতার বিস্তারিত জবানবন্দি সংগ্রহ করা হয়েছে। এই তথ্যপ্রমাণগুলি অভিযুক্তদের ১০ জুলাই পর্যন্ত পুলিশ হেফাজতে রাখার আবেদনের পক্ষে যথেষ্ট জোরালো বলে মনে করছে পুলিশ, এবং আদালতের আদেশের জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে।
এই ঘৃণ্য অপরাধের ঘটনায় অভিযুক্ত চারজন—মনোজিৎ মিশ্র, জায়েব আহমেদ, প্রমিত মুখোপাধ্যায় এবং নিরাপত্তারক্ষী পিনাকি ব্যানার্জি—বর্তমানে পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন। তাদের কাছ থেকে আরও তথ্য আদায়ের চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশ।
ঘটনার ভয়াবহতা ও নির্যাতিতার অভিযোগ:
ঘটনাটি ঘটে গত ২৫ জুন, যখন সাউথ কলকাতা ল কলেজের ভিতরে ২৪ বছর বয়সী এক প্রথম বর্ষের ছাত্রী গণধর্ষণের শিকার হন বলে অভিযোগ। নির্যাতিতার অভিযোগ অনুযায়ী, এই ঘটনার মূল অভিযুক্ত মনোজিৎ মিশ্র, যিনি তৃণমূল ছাত্র পরিষদের প্রাক্তন নেতা এবং কলেজের অস্থায়ী কর্মী। বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পরই মনোজিৎ মিশ্র তাকে জোর করে নিরাপত্তারক্ষীর কক্ষে নিয়ে যান।
সেখানে মনোজিৎ মিশ্র তাকে ধর্ষণ করেন। অভিযুক্ত জায়েব আহমেদ এবং প্রমিত মুখোপাধ্যায় সেই সময় দরজায় পাহারা দেন, যা এই ঘটনাকে একটি পরিকল্পিত গণধর্ষণে পরিণত করে। নির্যাতিতা আরও জানিয়েছেন, অভিযুক্তরা এই পাশবিক ঘটনার ভিডিও ধারণ করে এবং তাকে ভয় দেখিয়ে বলে যে, অভিযোগ করলে এই ভিডিও প্রকাশ করে দেওয়া হবে। এক মর্মস্পর্শী বর্ণনায় তিনি বলেন, “আমি তাঁর পায়ে ধরে ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করেছিলাম, কিন্তু তিনি ছাড়েননি।”
পুলিশের দ্রুত পদক্ষেপ ও তদন্তের অগ্রগতি:
কলকাতা পুলিশ এই ঘটনার খবর পাওয়ার পরই দ্রুত ব্যবস্থা নেয়। ২৬ জুন সন্ধ্যায় মনোজিৎ মিশ্র এবং জায়েব আহমেদকে তালবাগান ক্রসিং থেকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর মধ্যরাতে প্রমিত মুখোপাধ্যায়কে তার বাড়ি থেকে গ্রেফতার করা হয়। ২৮ জুন, ঘটনার সময় উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও কোনো সাহায্য না করার অভিযোগে নিরাপত্তারক্ষী পিনাকি ব্যানার্জিকে গ্রেফতার করা হয়।
তদন্তে পুলিশের হাতে এসেছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্যপ্রমাণ। অভিযুক্তদের মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে এবং সেখান থেকে একটি ১.৫ মিনিটের ভিডিও ক্লিপ পাওয়া গেছে, যা ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। পুলিশ তদন্ত করে দেখছে, এই ভিডিও অন্য কোথাও শেয়ার করা হয়েছে কিনা। মেডিক্যাল পরীক্ষায় নির্যাতিতার শরীরে জোরপূর্বক প্রবেশের চিহ্ন, কামড়ের দাগ এবং নখের আঁচড়ের প্রমাণ মিলেছে, যা তার অভিযোগের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। সিসিটিভি ফুটেজেও দেখা গেছে, নির্যাতিতাকে জোর করে নিরাপত্তারক্ষীর কক্ষে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং তিন অভিযুক্ত ও নিরাপত্তারক্ষীর গতিবিধি স্পষ্ট।
সৌরিন ঘোষাল সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, “সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুযায়ী, গণধর্ষণ মামলায় গ্রুপের সবাই দায়ী, এমনকি যদি সবাই সরাসরি ধর্ষণ না করে। এই ক্ষেত্রে, দুইজন সহায়তা করেছেন, তাই এটি গণধর্ষণের মামলা।”
বিশেষ তদন্ত দল ও পূর্বপরিকল্পনার ইঙ্গিত:
পুলিশ এই মামলার তদন্তের জন্য এসিপি প্রদীপ কুমার ঘোষালের তত্ত্বাবধানে পাঁচ সদস্যের একটি বিশেষ তদন্ত দল (এসআইটি) গঠন করেছে। এসআইটি’র প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, অভিযুক্তরা এই ধরনের অপরাধের জন্য আগে থেকেই পরিকল্পনা করেছিল এবং কলেজের অন্যান্য ছাত্রীদেরও যৌন হয়রানির শিকার করেছিল। তদন্তে আরও উঠে এসেছে যে, মনোজিৎ মিশ্র কলেজে অস্থিরতা সৃষ্টির জন্য পরিচিত ছিলেন। পুলিশ ২৫ জুন সন্ধ্যায় কলেজে উপস্থিত প্রায় ২৫ জনের একটি তালিকা তৈরি করেছে, যাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
রাজনৈতিক বিতর্ক ও জনরোষ:
এই ঘটনা রাজ্যে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক ও জনরোষের জন্ম দিয়েছে। বিজেপি অভিযোগ করেছে, তৃণমূল সরকার অভিযুক্তদের আশ্রয় দিচ্ছে এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদত্যাগ দাবি করেছে। বিজেপির আইটি সেল প্রধান অমিত মালব্য বলেছেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনে পশ্চিমবঙ্গ নারীদের জন্য দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠেছে।”
অন্যদিকে, তৃণমূল এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, তারা নির্যাতিতার পাশে রয়েছে এবং অভিযুক্তদের কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছে। তৃণমূল নেতা শশী পাঁজা বলেন, “আমরা অপরাধীদের আশ্রয় দিচ্ছি না। ১২ ঘণ্টার মধ্যে তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।”
জাতীয় মহিলা কমিশন (এনসিডব্লিউ) এই ঘটনার স্বতঃপ্রণোদিত সংজ্ঞান নিয়েছে এবং কলকাতা পুলিশ কমিশনার মনোজ ভার্মাকে তিন দিনের মধ্যে বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। কলকাতা হাইকোর্টে তিনটি এবং সুপ্রিম কোর্টে একটি পিটিশন দায়ের করা হয়েছে, যেখানে বিচারিক হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছে।
স্থানীয়রা এবং বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন এই ঘটনার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছে। শুক্রবার কসবা থানার সামনে এসএফআই এবং ডিওয়াইএফআই-এর সমর্থকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়, যেখানে বেশ কয়েকজন আহত হন। কসবা আইন কলেজ অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস স্থগিত করেছে।
এই ঘটনা ২০২৪ সালের আর.জি. কর মেডিক্যাল কলেজের ধর্ষণ-হত্যা মামলার স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে, যা রাজ্যে ব্যাপক প্রতিবাদের জন্ম দিয়েছিল। নির্যাতিতার পরিবার এবং স্থানীয়রা নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অভিযুক্তদের কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছে। পুলিশ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে, এবং আগামী দিনে এই মামলার ফলাফল রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।