কীভাবে ফাঁদ পাতে মনোজিৎ? কসবা গণধর্ষণ কাণ্ডে সামনে এল চাঞ্চল্যকর তথ্য

দক্ষিণ কলকাতার আইন কলেজের ছাত্রীকে গণধর্ষণের ঘটনাটি কি পূর্বপরিকল্পিত ছিল? বুধবার সন্ধ্যায় অভিযুক্তরা কি তাকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে বারবার আটকে রেখেছিল? কসবা গণধর্ষণ কাণ্ডের তদন্তকারীরা ঘটনার দিনের ঘটনাক্রম পর্যালোচনা করে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য অনুমান করছেন। অভিযোগকারিণীর এফআইআর (FIR), সিসিটিভি ফুটেজ, ফরেনসিক রিপোর্ট এবং বিভিন্ন তথ্যপ্রমাণের পারস্পরিক সঙ্গতি দেখিয়ে তদন্তকারী সংস্থা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে।
এফআইআর-এর বিস্ফোরক তথ্য:
অভিযোগকারিণী তার এফআইআর-এ দাবি করেছেন যে, ঘটনার দিন তিনি বারবার কলেজ থেকে বেরোতে চাইলেও তাকে জোর করে আটকে রাখা হয়েছিল। তিনি লিখেছেন:
“সন্ধে ৬.১০ নাগাদ আমি এবং কয়েকজন পড়ুয়া বেরোতে যাই। কিন্তু, ‘J’ (সম্ভবত ধৃত জইব) আমাদের আটকায় এবং আরও কিছুক্ষণ থাকতে বলে। আমরা থেকে যাই।”
পরবর্তী অংশে তিনি আরও লেখেন, “সাড়ে ৭টা নাগাদ GS (সাধারণ সম্পাদক) এই বলে বেরিয়ে যান, যে তিনি শীগগিরই কিছু কাজ সেরে ফিরে আসবেন। তখনই আমিও জিনিসপত্র গুছিয়ে বেরোতে যাই। তখন ‘J’ আমাকে আটকায় এবং ‘P’ (সম্ভবত প্রমিত) ও ‘M’ (সম্ভবত মনোজিত)-কে চোখের ইশারায় বাইরে যেতে বলে। তারা বেরিয়ে যায় এবং ‘J’-এর কথা মতো বাইরে থেকে দরজা আটকে দেয়।”
এই বয়ান থেকেই প্রশ্ন উঠছে, তাহলে কি অভিযুক্তরা আগে থেকেই অভিযোগকারিণীকে লক্ষ্যবস্তু করেছিল এবং তাকে আটকে রাখার জন্য পরিকল্পনা করেছিল?
প্রতিরোধের চিহ্ন ও প্রমাণ:
এফআইআর অনুযায়ী, প্যানিক অ্যাটাক হওয়ার পর ইনহেলার নিয়ে কিছুটা সুস্থ বোধ করলে নির্যাতিতা আবারও পালানোর চেষ্টা করেন। তিনি লিখেছেন, “আমি জিনিসপত্র গুছিয়ে বাইরে বেরোই পালানোর জন্য। তখন দেখি ওরা মেন গেট আটকে রেখেছে।” এরপরই গণধর্ষণের ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ।
তদন্তকারীরা সিসিটিভি ফুটেজ, মেডিক্যাল রিপোর্ট, কলেজের সামনের দোকান থেকে ইনহেলার কেনার তথ্য, ঘটনাস্থল থেকে হকিস্টিক উদ্ধার এবং মূল অভিযুক্ত মনোজিতের মোবাইল থেকে উদ্ধার হওয়া ভিডিও বিশ্লেষণ করে দেখছেন। সূত্রের খবর, নির্যাতিতার এফআইআর-এ দেওয়া পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণের সঙ্গে এই সমস্ত পারিপার্শ্বিক তথ্যপ্রমাণ হুবহু মিলে যাচ্ছে। এছাড়াও, ধৃত মনোজিতের দেহে নির্যাতিতার প্রতিরোধের ফলে সৃষ্ট ক্ষতচিহ্ন মিলেছে বলেও জানা গেছে।
নিরাপত্তারক্ষীর বয়ান ও সঙ্গতি:
আইন কলেজের ধৃত নিরাপত্তারক্ষী তার বয়ানে জানিয়েছেন, ঘটনার দিন সন্ধ্যায় প্রথম সেমিস্টারের আরও এক ছাত্রী কলেজে ছিলেন। ডে শিফটের গার্ড ওই ছাত্রীকে সন্ধ্যার দিকে কলেজ থেকে বেরিয়ে যেতে দেখেন। রাত ৮টা ২৫ মিনিটে ওই নিরাপত্তারক্ষীও কলেজ থেকে বেরিয়ে যান। তিনি পুলিশকে আরও জানিয়েছেন, ওই দিন মনোজিৎ, প্রমিতরা কলেজেই ছিল। সন্ধ্যার দিকে তিনি মনোজিতকে ইউনিয়ন রুমে দেখেছিলেন। পুলিশকে দেওয়া তার জবানবন্দি অনুযায়ী, মনোজিৎ তাকে ইউনিয়ন রুমের দরজা ফাঁক করে মনোজিৎ ও প্রমিত আছে কিনা জেনে ভিতরে পাঠিয়ে দিতে বলেছিলেন। পুলিশ সূত্রে খবর, নির্যাতিতার বয়ানের সঙ্গে ডে শিফটের গার্ডের এই বয়ান সম্পূর্ণ মিলে যাচ্ছে।
এই সমস্ত তথ্যপ্রমাণ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, কসবার এই গণধর্ষণের ঘটনাটি কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না, বরং এর পেছনে একটি সুপরিকল্পিত ছক কাজ করছিল। তদন্ত যত এগোচ্ছে, এই ঘটনার আরও ভয়াবহ দিকগুলো ততই সামনে আসছে।