অভাবের করুণ পরিণতি, তিস্তার তীরে সন্তানের জীবন বাঁচাতে গিয়ে ‘ঘাতক’ মা, প্রশাসনের তৎপরতায় স্বস্তি

পেটের তীব্র জ্বালা আর ক্ষুধার্ত সন্তানের ছটফটানি, এই দুইয়ের কাছে হার মানলেন এক মা। ময়নাগুড়ির তিস্তা নদীর তীরে অভাবের তাড়নায় নিজের একরত্তি সন্তানকে ভাসিয়ে দিতে উদ্যত হলেন এক অসহায় জননী। জলপাইগুড়ির ময়নাগুড়ি ব্লকের তিস্তা সেতু সংলগ্ন বার্নিস গ্রামপঞ্চায়েতের মরিচ বাড়ির এই মর্মান্তিক ঘটনা স্থানীয়দের তৎপরতায় শেষ পর্যন্ত এক ভয়াবহ পরিণতি থেকে রক্ষা পেয়েছে। ঘটনার পর ময়নাগুড়ি প্রশাসন দ্রুত আর্থিক সাহায্য ও সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে ওই পরিবারের দিকে।

তিস্তার ধারে মায়ের আর্তনাদ: ‘মর মর’

ঘটনাটি ঘটে সোমবার সকালে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সীমা বাউলি নামে ওই মহিলা তাঁর ক্ষুুধার্ত পুত্রকে নিয়ে তিস্তা নদীর ধারে আসেন। শিশুটি খাবারের জন্য কান্নাকাটি করছিল। মা হয়েও সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিতে না পারার যন্ত্রণা তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। এক চরম মুহূর্তে তিনি শিশুটিকে নদীর ধারে ফেলে দিয়ে বারবার বলতে থাকেন, “মর মর”।

সেই সময়ে নদীর পারে উপস্থিত দুই কিশোরী পল্লবী কীর্তনিয়া ও মল্লিকা পাল এবং বিশাখা পাট্টাদার নামে এক মহিলা এই দৃশ্য দেখেন। দেরি না করে তাঁরা সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গিয়ে শিশুটিকে তার মায়ের কোল থেকে ছিনিয়ে নেন। তাঁদের চিৎকারে লোকজন জড়ো হয়ে যায়। সন্তানের জীবন বিপন্ন করার চেষ্টার জন্য স্থানীয়রা ওই মহিলাকে মারধর শুরু করেন বলে অভিযোগ। পরে ময়নাগুড়ি থানার পুলিশকে খবর দেওয়া হলে তারা গিয়ে সীমা বাউলিকে উদ্ধার করে এবং মা ও ছেলেকে নিরাপদে বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।

অভাবের করুণ স্বীকারোক্তি: “বাচ্চাটা খাবারের জন্য কান্নাকাটি করছিল”

ঘটনার পর অনুতপ্ত সীমা বাউলি নিজের পরিস্থিতির কথা বলতে গিয়ে জানান, “বাড়িতে খাবার ছিল না। বাচ্চাটা খাবারের জন্য কান্নাকাটি করছিল। তাই আমি ওকে নদীতে ফেলতে গিয়েছিলাম।” তিনি আরও যোগ করেন, গত দুই সপ্তাহ ধরে তাদের বাড়িতে খাবার নেই। তার স্বামী বিপুল বাউলি প্রতিদিন কাজ পান না এবং গতকালই তিনি কাজে গিয়েছিলেন। স্বামীকে খাবারের কথা বললেও তিনি পাত্তা দেননি। সীমা বাউলি স্বীকার করেন, তিনি যা করেছেন, তা ঠিক করেননি। তিনি জানান, তার আধার কার্ড, রেশন কার্ড কিছুই নেই এবং স্কুলের সার্টিফিকেটও হারিয়ে ফেলেছেন, ফলে কোনো সরকারি সুযোগ-সুবিধাও পান না।

সীমা বাউলির স্বামী বিপুল বাউলি ঘটনা প্রসঙ্গে বলেন, “কাজের খোঁজে বাইরে বেরোনোর পর জানতে পারি, আমার স্ত্রী আমাদের পুত্র সন্তানকে নদীতে ফেলেছে। সঙ্গে সঙ্গে বাড়িতে ছুটে আসি। প্রতিদিন কাজ থাকে না, কয়েকদিন থেকে কাজ নেই। চাল শেষ হয়ে গিয়েছে। স্ত্রী কেন এমন করল বুঝতে পারলাম না।”

প্রশাসনের তৎপরতা ও প্রতিবেশীদের মানবিকতা

উদ্ধারকারী স্থানীয় বাসিন্দা বিশাখা পাট্টাদার ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, “আমরা তিস্তা নদীতে স্নান করতে গিয়েছিলাম। তিস্তা নদীর ধারে দেখি মহিলাটি বাচ্চাটিকে ধরে মারছে আর ‘মর মর’ বলছে। বাচ্চাটিকে তিস্তা নদীতে ফেলে দিতে যাচ্ছিল। সেই কারণেই আমরা দৌড়ে গিয়ে বাচ্চাটিকে বাঁচাই।” তিনি জানান, বাচ্চাটিকে কোলে তুলে নেওয়ার পর তার মা তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে আবারও শিশুটিকে নদীতে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এরপর তারা সবাই মিলে মহিলাকে ধরে ফেলেন। বিশাখা পাট্টাদার আরও জানান, এই ধরনের ঘটনা যেন আর না ঘটে। তার সঙ্গে আরও দুই জন স্কুলের ছাত্রী ছিলেন যারা উদ্ধারে সাহায্য করেন।

স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্য শিউলি কীর্তনীয়া বলেন, “আমি বাড়িতে ছিলাম না। শুনতে পেলাম বাচ্চাটিকে ওর মা তিস্তার জলে ফেলতে গিয়েছিল। বাচ্চাটিকে দু’জন মিলে উঠিয়ে নিয়ে আসে। আগে খাবারের অভাবের কথা আমাদের জানায়নি। এখন বলছে খাবারের অভাবেই এই কাজ করেছে। আগে যদি আমাদের জানাত আমরা সহযোগিতা করতাম।” তিনি আশ্বাস দেন, এখন প্রশাসনের তরফ থেকে সব সহযোগিতা করা হবে।

ময়নাগুড়ির জয়েন্ট বিডিও কাজি মহম্মদ মবিন ঘটনার খবর পেয়ে তড়িঘড়ি ঘটনাস্থলে যান। সীমা ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। সীমা কেন এমন ঘটনা ঘটালেন তা জানতে চান এবং তিনি সরকারি সমস্ত সুযোগ সুবিধা পাচ্ছেন কিনা তাও জিজ্ঞাসা করেন। সীমা জানান, তিনি কোনও সরকারি সুযোগ সুবিধা পান না। জয়েন্ট বিডিও তাকে আশ্বাস দেন যে, সরকারি সুযোগ সুবিধা যাতে তিনি পান তার ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে। আজ বিডিও অফিসের পক্ষ থেকে প্রাথমিকভাবে সীমার হাতে খাবার ও জামাকাপড় তুলে দেওয়া হয়। জয়েন্ট বিডিও বলেন, “পরিবারটি সামান্য অসুবিধাতেই আছে। আমরা বললাম এমন ঘটনা যেন আর না-ঘটে। প্রতিবেশীদের পাশে থাকতে বলা হয়েছে। সরকারি সমস্ত সুযোগ সুবিধা যাতে তিনি পান সেই ব্যবস্থা আমরা করছি। স্কুলের সার্টিফিকেট হারিয়ে গিয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি তাঁকে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করার জন্য।”

এই ঘটনা আবারও সমাজের গভীরে প্রোথিত দারিদ্র্য ও ক্ষুধার্ত মানুষের অসহায়তার এক করুণ চিত্র তুলে ধরল, যা সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বাস্তবায়নে আরও নজরদারির প্রয়োজনীয়তা স্মরণ করিয়ে দেয়।