কসবার আইন কলেজে থমথমে পরিস্থিতি, ছাত্রীর ওপর নারকীয় অত্যাচারের প্রতিবাদে পঠন-পাঠন বন্ধ, উত্তাল ছাত্র বিক্ষোভ

কসবার আইন কলেজে এক ছাত্রীর উপর ঘটে যাওয়া নারকীয় ঘটনার প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছে ক্যাম্পাস। এই জঘন্য অপরাধের পর থেকে কলেজের সমস্ত পঠন-পাঠন বন্ধ হয়ে গেছে। কলেজ কর্তৃপক্ষ রবিবার গভীর রাতে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, যতক্ষণ না গভর্নিং বডি কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, ক্লাস বন্ধই থাকবে। এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সোমবার থেকেই শিক্ষার্থীরা কলেজের সামনে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছেন। তাঁদের মূল দাবি একটাই—অবিলম্বে কলেজের পড়াশোনার সুস্থ পরিবেশ এবং নিরাপত্তা ফিরিয়ে দিতে হবে।
কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় ক্ষোভ, অভিযুক্তের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন
শিক্ষার্থীরা সোমবার সকালে কলেজ কর্তৃপক্ষের জারি করা বিজ্ঞপ্তি হাতে পান। এরপরই তাঁরা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তুলে ধরেন। তাদের অভিযোগ, কলেজের নিরাপত্তা নিয়ে কর্তৃপক্ষ চরম উদাসীন। আজ কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল উপস্থিত না থাকায়, শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়ে তাঁদের বিভাগীয় প্রধানের কাছে একটি ডেপুটেশন জমা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এই ডেপুটেশনে তাঁদের প্রধান দাবি ছিল, ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা হোক।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, এই ঘটনার মূল অভিযুক্ত মনোজিত মিশ্রের কলেজে একচ্ছত্র প্রভাব ছিল। এক ছাত্রী, সৃষ্টি আহের, জানান, “১৮ জুন আমাদের শেষ মৌখিক পরীক্ষা ছিল। সেদিন আমরা দেখি, দুজন বহিরাগত ছেলে দুজন মেয়ের সঙ্গে কলেজে ঢুকে সরাসরি সপ্তম তলায় উঠে যায়। আমরা পরিচয় জানতে চাইলে, তারা বলতে পারেনি। অথচ কলেজ কর্তৃপক্ষ তখন শুধু ওই দুই মেয়েকে দিয়ে একটি ‘সরি’ চিঠি লিখিয়ে নেয়, আর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বহিরাগতকে দিয়ে শুধু একটা চিঠি লিখিয়ে নেওয়া কখনই যথেষ্ট নয়।”
আরেক ছাত্রী, ভাগ্মী ত্রিবেদী, যোগ করেন, “আমরা কলেজে ঢোকার পর থেকেই মনোজিত মিশ্রকে অত্যন্ত প্রভাবশালী হিসেবে দেখেছিলাম। সে বলতো, ‘তোমরা আমার বিরুদ্ধে যা বলার বলতে পারো, আমি সব দেখে নেব।’ সে নিজেকে এমনভাবে উপস্থাপন করতো যেন মনে হতো, কোনো সমস্যায় পড়লে ওর কাছেই সবাইকে যেতে হবে।”
নিরাপত্তার চরম অভাব: সিসিটিভি ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ক্যাম্পাসের দাবি
বর্তমানে কলেজের প্রবেশপথে একাধিক সিসি ক্যামেরা দেখা গেলেও, শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, এই ক্যামেরাগুলো আগে ছিল না এবং বিল্ডিংয়ের ভিতরেও ক্যামেরার অভাব রয়েছে। শিক্ষার্থীরা বলছেন, কলেজে তাঁরা মোটেও সুরক্ষিত নন এবং রীতিমতো আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। তাঁদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে ডেপুটেশনে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছেন তাঁরা।
এক ছাত্রী, দেবদ্যুতি সেনগুপ্ত, স্পষ্ট জানান, “আমরা এই কলেজের সিসিটিভি ক্যামেরা চাইছি। আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। কলেজে কোনো রাজনৈতিক প্রভাব থাকবে না; একটি অরাজনৈতিক কলেজ তৈরি হোক। আমরা চাই, আমাদের কলেজের পড়াশোনার পরিবেশটা ফিরে আসুক, যেটা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গিয়েছে।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দ্বিতীয় বর্ষের দুই ছাত্রী মনোজিতের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ এনেছেন। তাঁরা বলেন, “২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে কলেজের একটি পিকনিকের আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে মনোজিত মিশ্রও গিয়েছিল। তখন আমাদেরই এক সহপাঠীর শ্লীলতাহানি করা হয়। অন্যান্য সিনিয়ররা ওই মেয়েটিকে সাহায্য করার কথা বললেও, মনোজিত মিশ্র হুমকি দিয়েছিল। ওর ভয়ে আমরা কলেজে আসতেই ভয় পেতাম।”
অভিযুক্তের ভর্তি প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন
এদিকে, শিক্ষার্থীদের একটি অংশ গণধর্ষণের ঘটনায় ধৃত জইব আহমেদের ভর্তি প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের অভিযোগ, জইব আহমেদ ভর্তি পরীক্ষায় ২৬৩৪তম স্থান অর্জন করেছিল, যা দিয়ে এই কলেজে সুযোগ পাওয়া কার্যত অসম্ভব। এত নিচু র্যাঙ্কিংয়ে কীভাবে সে দক্ষিণ কলকাতার এই আইন কলেজে পড়াশোনা করছে, তা নিয়ে শিক্ষার্থীরা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।