“মনোজিৎকে আগে চিনতাম না”-কসবা কাণ্ডে অবাক জ়ইবের কাকা, শোরগোল রাজ্যজুড়ে

গণধর্ষণ কাণ্ড: অভিযুক্তদের পরিবারের প্রতিক্রিয়া; প্রতিবেশীদের ক্ষোভ, বাবা-মায়ের নীরবতা ও চাচার অবিশ্বাস
হাওড়া/তপসিয়া, ৩০ জুন, ২০২৫: দক্ষিণ কলকাতার আইন কলেজে ঘটে যাওয়া গণধর্ষণ কাণ্ডে অভিযুক্ত প্রমিত মুখোপাধ্যায় ও জ়ইব আহমেদের পরিবার এখন তীব্র মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে প্রমিতের বাবা-মায়ের নিদারুণ নীরবতা ও প্রতিবেশীদের ক্ষোভ, অন্যদিকে জ়ইবের চাচার ছেলের নির্দোষিতা প্রমাণের চেষ্টা— সব মিলিয়ে কসবা কাণ্ডের আঁচ ছড়িয়ে পড়েছে অভিযুক্তদের বাড়িতেও।

প্রমিতের পরিবার: প্রতিবেশীদের ক্ষোভ ও নীরবতার আড়ালে ভাঙা স্বপ্ন
হাওড়ার চ্যাটার্জিহাটে প্রমিত মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, রবিবারও তার বাবা-মা, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক প্রবীর মুখোপাধ্যায় ও তার স্ত্রী, কারও সঙ্গে কথা বলছেন না। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ঘটনার দিন থেকে পরিবারটি কার্যত গৃহবন্দী। বহুবার বেল বাজিয়েও কোনো সাড়া মেলেনি। তাদের দাবি, অধ্যাপক হিসেবে প্রবীরের এতদিনের তিলে তিলে গড়া ভাবমূর্তি এভাবে ভেঙে পড়বে, তা তারা দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি। হয়তো মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েছেন বলেই তারা মুখ দেখাতে চাইছেন না।

তবে রবিবারই এক ভিন্ন চিত্র দেখেন প্রমিতের বাবা-মা। পুলিশ যখন তদন্তের স্বার্থে প্রমিতকে নিয়ে তাদের বাড়ির দোরগোড়ায় আসে, তখন স্থানীয়দের একাংশ মারমুখী হয়ে ওঠে। তারা প্রমিতের কঠোরতম শাস্তির দাবি জানায়। কোনোমতে পুলিশ অভিযুক্তকে নিয়ে তাদের বাড়িতে প্রবেশ করে।

অথচ স্থানীয় বাসিন্দা আর্য্য কাঁড়ার বলেন, ছোট থেকেই প্রমিতকে দেখেছেন তারা। তাকে কখনো উঁচু গলায় কথা বলতেও শোনেননি। তার পরিবারকেও ‘ভালো পরিবার’ হিসেবেই জানতেন। এই অপ্রত্যাশিত ঘটনায় তারাও স্তম্ভিত।

সকাল প্রায় পৌনে বারোটা নাগাদ কসবা পুলিশের গাড়ি চ্যাটার্জিহাটের হরিনাথ ন্যায়রত্ন লেনে প্রবেশ করে। কাপড়ে-ঢাকা মুখ ও কোমরে দড়ি বাঁধা অবস্থায় প্রমিতকে নিয়ে পুলিশ প্রবীরের বাড়িতে ঢোকে। প্রবীর মুখোপাধ্যায় নিজেই দরজা খুলে দেন। পুলিশ অফিসাররা তাকে ও তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। জানা গেছে, বাড়ির মধ্যে প্রমিতের কোনো ইলেকট্রনিক গ্যাজেট পাওয়া যায় কিনা, তা খতিয়ে দেখতে তল্লাশিও চালানো হয়।

জ়ইবের পরিবার: ‘ম্যাঙ্গো’র প্রভাব ও চাচার বিস্ময়
এই ঘটনায় অপর অভিযুক্ত জ়ইব আহমেদ, যে কিনা মূল অভিযুক্ত মনোজিৎ মিশ্র ওরফে ‘ম্যাঙ্গো’র দোসর। জ়ইব ও প্রমিতের বিরুদ্ধে সরাসরি ধর্ষণের অভিযোগ না থাকলেও, পুরো ঘটনাচক্রে মনোজিৎকে সাহায্য করার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

তপসিয়ার জিজে খান রোডে জ়ইবের বাড়ি। তার বাবা জ়ুনেদ আহমেদ বানতলা লেদার কমপ্লেক্সে ‘জ়ইব এন্টারপ্রাইজ়’ নামে ব্যবসা করেন। কসবার ঘটনায় জ়ইব বর্তমানে পুলিশ হেফাজতে রয়েছে।

রবিবার জ়ইবের কাকা উবেইদ আহমেদ গণমাধ্যমকে জানান, তারা ‘ম্যাঙ্গো’র নাম বেশিদিন শোনেননি। জ়ইব মনোজিতের সঙ্গে মেলামেশা শুরু করার পরই তার নাম শুনতে শুরু করেন। জ়ইব পড়াশোনা করবে বলে কলেজে যেত, তাই সে এই ঘৃণ্য ঘটনায় কীভাবে যুক্ত হলো, তা ভেবে হতবাক উবেইদ। তিনি জানান, পুলিশ জ়ইবকে গ্রেপ্তার না করা পর্যন্ত তারা এ বিষয়ে কিছুই জানতেন না। এমনকি তারা জ়ইবের সঙ্গে কথা বলতেও পারেননি, ফলে ঠিক কী ঘটেছিল, তা তাদের অজানা। সংবাদের মাধ্যমে তারা জানতে পেরেছেন যে জ়ইব ঘটনাস্থলে ছিল।

উবেইদ আহমেদ দৃঢ়ভাবে দাবি করেন, “এই ধরনের অপরাধের সঙ্গে জ়ইব কিছুতেই জড়িত থাকতে পারে না।” তিনি বলেন, “কিছু বলার আগে জ়ইবের সঙ্গে আমরা কথা বলতে চাই।” জ়ইবের কাকা জানান, ঘটনার রাতে জ়ইব বাড়ি ফিরে আসে, তবে এ বিষয়ে কারও সঙ্গে কোনো কথা হয়নি। উবেইদের দাবি, “তিন দশকের বেশি তপসিয়ায় আমাদের বাস। কোনো অসামাজিক কাজে আমাদের কেউ কখনও জড়িত ছিল না।” জ়ইব তিন ভাইবোনের মধ্যে সবথেকে বড় এবং তার ছোট ভাই ও বোন স্কুলে পড়ে।

গণধর্ষণ কাণ্ডের তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই অভিযুক্তদের পারিবারিক প্রেক্ষাপট এবং সমাজের ওপর এর প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এই ঘটনা শুধু অপরাধের গভীরতাই নয়, পরিবারের সম্মান ও সামাজিক প্রতিক্রিয়ার এক বেদনাদায়ক চিত্রও তুলে ধরছে।