“প্রমিতের মা-বাবা চুপ, বিশ্বাস হচ্ছে না জ়ইবের কাকার”-কসবা গণধর্ষণ কাণ্ডে শোরগোল বাংলায়

কসবা আইন কলেজে গণধর্ষণ কাণ্ডে মূল অভিযুক্ত মনোজিৎ মিশ্রের দুই সহযোগী জ়ইব আহমেদ ও প্রমিত মুখার্জির গ্রেপ্তারির পর তোলপাড় রাজ্য। এদের মধ্যে প্রমিত মুখার্জির হাওড়ার চ্যাটার্জিহাটের বাড়ি এখন প্রতিবেশীদের রোষ ও বিস্ময়ের কেন্দ্রবিন্দুতে। এক অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপকের ছেলে এমন জঘন্য অপরাধে জড়িয়ে পড়ায় স্থানীয়রা যেমন স্তম্ভিত, তেমনই প্রমিতের বাবা-মা চরম মানসিক অবসাদে গৃহবন্দী হয়ে পড়েছেন বলে জানা গেছে।
চ্যাটার্জিহাটের হরিনাথ ন্যায়রত্ন লেনে প্রমিতের পৈতৃক বাড়ি। বাবা প্রবীর মুখোপাধ্যায় একজন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক। স্থানীয়দের দাবি, এত বছর ধরে তিলে তিলে গড়ে তোলা অধ্যাপকের সম্মান এভাবে ভেঙে পড়বে, তা তারা দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি। ঘটনার পর থেকে প্রমিতের বাবা-মা কারও সঙ্গে কথা বলছেন না, বাড়ির দরজা বন্ধ রেখেছেন। রবিবারও বহুবার বেল বাজিয়ে সাড়া মেলেনি। প্রতিবেশীরা মনে করছেন, এই বয়স্ক দম্পতি মানসিকভাবে এতটাই ভেঙে পড়েছেন যে মুখ দেখানোর সাহস পাচ্ছেন না। এতদিনের চেনা প্রতিবেশীদের বদলে যাওয়া চাহনি হয়তো তাদের কাছে অসহনীয় হয়ে উঠেছে।
রবিবার সকালে সেই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হলেন প্রমিতের বাবা-মা। সকাল পৌনে বারোটা নাগাদ কসবা পুলিশের একটি দল প্রমিতকে নিয়ে তাদের বাড়ির দোরগোড়ায় পৌঁছায়। কাপড়ে মুখ ঢাকা, কোমরে দড়ি বাঁধা প্রমিতকে দেখে স্থানীয়দের একাংশ মারমুখী হয়ে ওঠে। তারা প্রমিতের কঠিনতম শাস্তির দাবি জানায়। কোনোমতে পুলিশ অভিযুক্তকে নিয়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে।
পুলিশের উপস্থিতি দেখে প্রমিতের বাবা প্রবীর মুখোপাধ্যায় নিজেই দরজা খুলে দেন। এরপর পুলিশ অফিসারেরা তাকে ও তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। জানা গেছে, ঘটনার সঙ্গে জড়িত কোনো ইলেকট্রনিক গ্যাজেট বা প্রমাণ আছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে প্রমিতের বাড়িতে তল্লাশি চালানো হয়।
চ্যাটার্জিহাটের স্থানীয় বাসিন্দা আর্য্য কাঁড়ার হতবাক হয়ে বলেছেন, “ছোট থেকেই ছেলেটিকে (প্রমিত) দেখেছি আমরা। সেভাবে কারও সঙ্গে উঁচু গলায় কথা বলতেও দেখিনি। খুব ভালো পরিবার।” এমন একটি ছেলে কীভাবে এমন ঘৃণ্য অপরাধে জড়াতে পারে, তা নিয়ে তার মতো বহু প্রতিবেশীই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
এই ঘটনায় অন্য অভিযুক্ত জ়ইব আহমেদের বাড়ি তপসিয়ার জিজে খান রোডে। তার বাবা জ়ুনেদ আহমেদ বানতলা লেদার কমপ্লেক্সে ‘জ়ইব এন্টারপ্রাইজ়’ নামে ব্যবসা করেন। কসবার ঘটনায় জ়ইবও পুলিশ হেফাজতে রয়েছে। রবিবার জ়ইবের কাকা উবেইদ আহমেদ জানিয়েছেন, মনোজিৎ মিশ্রের নাম তারা বেশিদিন শোনেননি। জ়ইব মনোজিতের সঙ্গে মেলামেশা শুরু করার পর থেকেই তার নাম শুনতে শুরু করেন।
উবেইদের দাবি, “জ়ইব পড়াশোনা করবে বলে কলেজে যেত। তাই সে এই ঘটনায় কী ভাবে যুক্ত হল, তা আমাদের হতবাক করছে।” তিনি আরও জানান যে, পুলিশ জ়ইবকে গ্রেপ্তার না করা পর্যন্ত তারা এ বিষয়ে কিছুই জানতেন না। এমনকি তারা জ়ইবের সঙ্গে কথা বলতেও পারেননি, তাই ঠিক কী ঘটেছিল সে বিষয়ে তারা কিছুই জানেন না। সংবাদমাধ্যম থেকে জেনেছেন যে জ়ইব ঘটনাস্থলে ছিল।
উবেইদ আহমেদ জোর দিয়ে বলেছেন, “এই ধরনের অপরাধের সঙ্গে জ়ইব কিছুতেই জড়িত থাকতে পারে না।” তিনি বলেন, “কিছু বলার আগে জ়ইবের সঙ্গে আমরা কথা বলতে চাই।” উবেইদ দাবি করেন, “তিন দশকের বেশি তপসিয়ায় আমাদের বাস। কোনো অসামাজিক কাজে আমাদের কেউ কখনও জড়িত ছিল না।” জ়ইব তিন ভাইবোনের মধ্যে সবথেকে বড়, তার ছোট ভাই ও বোন স্কুলে পড়ে।
উল্লেখ্য, জ়ইব ও প্রমিত – দু’জনের বিরুদ্ধেই সরাসরি ধর্ষণের অভিযোগ না থাকলেও, মূল ঘটনাক্রমে মনোজিৎকে সাহায্য করায় তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই ঘটনায় রাজ্যজুড়ে চাঞ্চল্য অব্যাহত এবং তদন্তের প্রতিটি ধাপে নতুন তথ্য উন্মোচিত হচ্ছে।