বিলুপ্তপ্রায় ‘বাটাগুর বাসকা’র প্রত্যাবর্তন, সুন্দরবনের হাত ধরে নতুন আশার আলো, জন্ম নিলো ২২৩টি কচ্ছপ!

একসময় বিশ্বের প্রায় প্রতিটি মহাসাগর ও সাগরের প্রান্তে অবাধ বিচরণ ছিল ‘বাটাগুর বাসকা’ প্রজাতির কচ্ছপের। কিন্তু মাংসের জন্য নির্বিচার শিকার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই প্রজাতিটি আজ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। তবে, এই চরম সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে এক দারুণ খবর শুনিয়েছে সুন্দরবন টাইগার রিজার্ভ কর্তৃপক্ষ – বিরল প্রজাতির এই কচ্ছপ সংরক্ষণে তারা এক বিশাল সাফল্য অর্জন করেছে, সম্প্রতি কৃত্রিম উপায়ে জন্ম হয়েছে ২২৩টি বাটাগুর বাসকা কচ্ছপের!
সংরক্ষণের এক দশকের যাত্রা:
সুন্দরবন টাইগার রিজার্ভ কর্তৃপক্ষ মাত্র সাতটি পুরুষ ও পাঁচটি স্ত্রী বাটাগুর বাসকা কচ্ছপ নিয়ে এই মহৎ সংরক্ষণের কাজটি শুরু করেছিল। দীর্ঘ কয়েক বছরের নিরলস প্রচেষ্টায় সেই সংখ্যাটা এখন ৬৫০ ছাড়িয়ে গেছে। এই সাফল্য কর্তৃপক্ষকে আরও উৎসাহিত করেছে।
সুন্দরবন টাইগার রিজার্ভের ডেপুটি ফিল্ড ডিরেক্টর জোন্স জাস্টিন উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলেন, “পৃথিবীতে আর কোথাও এই প্রজাতির কচ্ছপ প্রায় নেই বললেই চলে। আমরা জানি না, বাটাগুর বাসকা প্রজাতির কচ্ছপরা আর কোন-কোন পরিবেশে থাকতে পছন্দ করে। তবে, আমরা এই সংরক্ষণের কাজটা শুরু করেছিলাম মাত্র সাতটা পুরুষ ও পাঁচটা স্ত্রী কচ্ছপ নিয়ে। ধীরে ধীরে প্রাকৃতিক উপায়ে প্রজনন ঘটিয়ে বাটাগুর বাসকার বংশবৃদ্ধি করেছি। তবে, গত তিন বছরে আমরা কৃত্রিম উপায়ে ডিম ফুটিয়ে এই প্রজাতির কচ্ছপের বংশবৃদ্ধি করাতে সফল হয়েছি। চলতি বছরে কৃত্রিম উপায়ে মোট ২২৩টি কচ্ছপের জন্ম হয়েছে। বর্তমানে ৬৫০-এর বেশি বাটাগুর বাসকা কচ্ছপ রয়েছে সুন্দরবন টাইগার রিজার্ভের তত্ত্বাবধানে।”
বিলুপ্তির কারণ ও পুনঃপ্রতিষ্ঠার স্বপ্ন:
একসময় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সুন্দরবন ছাড়াও মায়ানমার, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার উপকূলে এই বাটাগুর বাসকা কচ্ছপের বিশাল বসতি ছিল। কিন্তু এর সুস্বাদু মাংসের লোভে মানুষ যথেচ্ছভাবে শিকার শুরু করে, যা এই প্রজাতিকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে।
সুন্দরবন টাইগার রিজার্ভ কর্তৃপক্ষ এখন এই বিরল প্রজাতিকে তার প্রাকৃতিক পরিবেশে ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন দেখছে। জোন্স জাস্টিন জানান, “২০২২ সালে সুন্দরবন টাইগার রিজার্ভের তরফে ১০টি বাটাগুর বাসকাকে জঙ্গল ও জলে ছাড়া হয়েছিল। তাদের সবার গায়ে ট্রান্সমিটার লাগানো ছিল। সেই ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে আমরা এই বাটাগুর বাসকার গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করেছি এবং তাদের সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেছি। তারা কোন-কোন জায়গায় থাকতে পছন্দ করে, তার কিছুটা ধারণা পাওয়া গিয়েছে।”
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: প্রকৃতির কোলে ফেরা:
সুন্দরবন টাইগার রিজার্ভের আগামী দিনের পরিকল্পনা আরও সুদূরপ্রসারী। জোন্স জাস্টিন বলেন, “আগামী দিনেও আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে, আরও অনেক বাটাগুর বাসকাকে প্রকৃতিতে ছেড়ে দেওয়ার। তবে, সেটা একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে, যেখানে তারা থাকতে পছন্দ করে। প্রতি বছরে ১০০-২০০টি করে কচ্ছপ ছাড়া হবে।”
কর্তৃপক্ষ মনে করছে, আগামী দিনে সুন্দরবনে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের পাশাপাশি এই বাটাগুর বাসকা কচ্ছপও পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। এই সাফল্য কেবল সুন্দরবনের পরিবেশেরই উন্নতি ঘটাবে না, বরং বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির সংরক্ষণে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের জন্যও একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।