কসবার লজ্জায় উত্তাল মহানগরী, আরজিকর-এর ছায়া, প্রশ্নের মুখে নারী নিরাপত্তা ও সরকারের ভূমিকা!

প্রায় সাড়ে দশ মাস আগে আরজিকর মেডিক্যাল কলেজে এক চিকিৎসক ছাত্রীর ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা রাজ্যকে নাড়িয়ে দিয়েছিল, দেশজুড়ে তৈরি হয়েছিল প্রতিবাদ। সেই ভয়াবহ স্মৃতি আজ আবার ফিরে এসেছে মহানগরীতে। দিঘার রথযাত্রা নিয়ে যখন শহরে শোরগোল, তখনই কসবার একটি আইন কলেজের গার্ডরুমে এক ছাত্রীর গণধর্ষণের ঘটনায় উত্তাল হয়েছে রাজ্য-রাজনীতি। অভিযুক্তরা কলেজেরই দুই ছাত্র ও এক প্রাক্তন, যার ফলে নারী নিরাপত্তা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন।
আরজিকর-এর পুনরাবৃত্তি?
কসবার এই ঘটনায় বারে বারে আরজিকর কাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে রাজ্য সরকারকে বিঁধেছেন বিরোধীরা। আরজিকর ঘটনায় কলকাতা পুলিশকে প্রবল অস্বস্তিতে পড়তে হয়েছিল, যার জেরে তৎকালীন নগরপাল বিনীত গোয়েল এবং টালা থানার ওসি অভিজিৎ মণ্ডল-সহ বেশ কয়েকজন পুলিশ আধিকারিককে দায়িত্ব থেকে সরাতে হয়েছিল। কসবা কাণ্ডেও বিরোধীরা পুলিশের ‘নিষ্ক্রিয়তার’ দিকেই আঙুল তুলেছেন এবং সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকে অভিযোগের তীর ছুড়েছেন।
রাজনৈতিক মহলে ঝড়: বিক্ষোভ, অভিযোগ, এবং পাল্টা যুক্তি
এই ঘটনার খবর সামনে আসতেই কসবা থানার সামনে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের সদস্যরা বিক্ষোভ দেখান। বাম ছাত্র সংগঠন এসএফআই ও ডিওয়াইএফআই কলেজের ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করলে উত্তেজনা ছড়ায়। এ সময় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি ছিঁড়ে ফেলা হয়।
দুপুরে সাউথ ক্যালকাটা ল কলেজের সামনে বিক্ষোভ দেখায় এআইডিএসও। সংগঠনের কলকাতা জেলার সভাপতি পিন্টু দাস বলেন, “আজকে রাজ্যজুড়ে নারীদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত। অভয়া কাণ্ডে যেভাবে দোষীদের আড়াল করেছে শাসকদল, তাতে দুষ্কৃতীরা সাহস পেয়ে গেছে। কারণ তারা জানে তাদের এই অপকর্মে মাথায় বসে থাকবে সরকার ও প্রশাসন। কিন্তু আমরা এর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”
ভারতের ছাত্র ফেডারেশনের রাজ্য কমিটির সম্পাদক দেবাঞ্জন দে সরাসরি তৃণমূল কংগ্রেসের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলে বলেন, “সাউথ কলকাতা ল কলেজকে কেন্দ্র করে তৃণমূল দীর্ঘদিন ধরে ক্রাইম সিন্ডিকেট চালিয়ে এসেছে। একটা অপরাধ চক্র ক্যাম্পাসের ভিতর কাজ করছে প্রতিদিন। পুলিশ প্রশাসন নীরব ভূমিকা পালন করছে।” তিনি আরও বলেন, “অভিযুক্ত মনোজিৎ টিএমসিপি নেতা, যার নামে ১০ বছরে ৩০টা দুর্নীতির অভিযোগ, থ্রেট দেওয়ার অভিযোগ, শ্লীলতাহানির অভিযোগ। কসবা থানা জানত না? কেন ব্যবস্থা নেয়নি? এই ধরনের একজন অপরাধী কেন ক্যাম্পাসের ভিতর থাকবে? এটা পড়ার জায়গা নাকি অপরাধী তৈরির জায়গা? তৃণমূল নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখতে এই ধরনের অপরাধীদের পুষেছে।”
বিরোধী নেতাদের সরব কণ্ঠ
বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী এই ঘটনার জন্য সরাসরি পুলিশকে দায়ী করে বলেন, “এই ঘটনার জন্য পুলিশ দায়ী। মনোজ ভার্মা থেকে শুরু করে বিনীত গোয়েল এবং বাকি সব পুলিশ দিঘায় রয়েছে। পুরো কলকাতা পুলিশকে নিয়ে চলে গিয়েছে ওখানে। এই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে থাকার যোগ্যতা নেই।” তিনি আরও বলেন, “বিজেপি এই বিষয়টা নিয়ে লড়বে। খুব বড় পদক্ষেপ করা হবে। সুপ্রিম কোর্টের এই সরকারকে উচিত শাস্তি দেওয়া উচিত।”
রাজ্য বিজেপি নেতা তথা রাজ্যসভার সাংসদ শমীক ভট্টাচার্য বলেন, “আজকের এই ঘটনা সারা দেশকে একটা বার্তা দিল। একটি কলেজ ক্যাম্পাসের ভেতরে এক ছাত্রীর গণধর্ষণ করা হল। আর দোষী কে? তৃণমূল কংগ্রেস। তৃণমূল কংগ্রেসের সব নেতার সঙ্গে অভিযুক্তের ছবি রয়েছে।” তিনি প্রশাসনের নিস্ক্রিয়তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
বিজেপির রাজ্য সাধারণ সম্পাদক লকেট চট্টোপাধ্যায় ঘটনাটিকে ‘অত্যন্ত ন্যক্কারজনক’ বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, “২০১১ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত একের পর এক এই ধরনের ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। কলকাতার মতো জায়গায় এই ধরনের ঘটনা ঘটে গেল, আর এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত তৃণমূল কংগ্রেস। এরপর তারা তথ্য প্রমাণ লোপাট করার চেষ্টা করবে।” তিনি সকল মহিলাকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে প্রতিবাদ করার আহ্বান জানান।
বিজেপির বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পাল হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “এই ঘটনা ঘটেছে বুধবার। আজ এই ঘটনাটি সামনে এসেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুলিশ প্রশাসন কী তাহলে আবার এই ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল?” তিনি অভিযুক্তদের তৃণমূলের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ তোলেন এবং বলেন, “যদি এই ঘটনাকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয় তাহলে পশ্চিমবঙ্গে আগুন জ্বলবে।”
বিজেপির আর এক নেতা রাকেশ সিং কসবা থানার সামনে বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেন। তাঁর দাবি, “আরজিকর-এর মতো এই ঘটনাও ধামাচাপা পড়ে যাবে। এরা কিছুতেই তদন্ত করবে না। প্রশাসনের সঙ্গে এদের মদত রয়েছে।” এ সময় বিজেপি কর্মী-সমর্থকরা জোরপূর্বক কসবা থানার গেট খুলে ঢোকার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে তাদের বচসা হয়।
কংগ্রেসও এই ঘটনায় রাজ্য সরকারকে বিঁধেছে। প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার বলেন, “রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে। প্রশ্রয় পাচ্ছে তাই এ ধরনের অপরাধ হয়ে চলেছে। আরজিকর মেডিক্যাল কলেজেও প্রাক্তনরা ঢুকত, বহিরাগতরা ঢুকত। এই ল কলেজেও একই অবস্থা। কলেজে নিরাপত্তা কোথায়!”
শাসক দলের প্রতিক্রিয়া
যদিও এই বিষয়ে নিরাপত্তায় গাফিলতির প্রসঙ্গ এড়িয়ে একদল পুরুষের মানসিকতার বিকৃতির কারণেই সমাজে এই ধরনের ঘটনা ঘটছে বলে মনে করেন শ্রীরামপুরের তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, “নিঃসন্দেহে অন্যায় করেছে। যারা করেছে তাদের ইমিডিয়েটলি অ্যারেস্ট করা উচিত। এই সমস্ত ধর্ষণ, শ্লীলতাহানি এগুলো কারা করে? কিছু পুরুষ আছে যারা বিকৃত মস্তিষ্কের। মহিলাদের তাদের বিরুদ্ধেই লড়াই করা উচিত।” তিনি আরও বলেন, “শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভিতরে কি পুলিশ থাকবে? নিরাপত্তা কে দেবে? তাঁর সহকর্মীরা নিরাপত্তা দেবে। সেখানে সহকর্মীরাই ধর্ষণ করছে তাহলে অন্যায়টা কারা করছে?”
মেয়র ফিরহাদ হাকিম অবশ্য এই স্পর্শকাতর বিষয়ে বেশি কিছু বলতে চাননি। তিনি বলেন, “এটা অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। আমি জানি না, আপনি বললেন। আমি পুলিশের কাছে খবর নেব।”
কসবার এই ঘটনা রাজ্যজুড়ে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, যেখানে নারী নিরাপত্তা, পুলিশের ভূমিকা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। এই ঘটনা রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে কী প্রভাব ফেলে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।