AI-কে যেসব প্রশ্ন করলে সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণ হয়, জেনেনিন কোন কোন বিষয়?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) আমাদের জীবনকে সহজ করলেও, এর পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জার্মানির ‘হোকশুল মিউনিখ ইউনিভার্সিটি অফ অ্যাপ্লাইড সায়েন্সেস’-এর সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য: ওপেনএআই-এর চ্যাটজিপিটি-র মতো বিভিন্ন এআই চ্যাটবটকে যখন ‘যুক্তি দিয়ে চিন্তা করে’ কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে বলা হয়, তখন সেসব প্রশ্নের উত্তরে সাধারণ প্রশ্নের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে কার্বন ডাইঅক্সাইড নিঃসরণ ঘটে।
‘ফ্রন্টিয়ার্স’ জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় ১৪টি লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম)-এর পারফরম্যান্স তুলনা করা হয়েছে। গবেষকরা দেখিয়েছেন যে, জটিল যুক্তি প্রয়োগ করে দেওয়া এআইয়ের বিভিন্ন উত্তর সরল উত্তরের চেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণ ঘটায়। উদাহরণস্বরূপ, স্কুলের ইতিহাসের মতো সহজ, সরল বিষয়ের তুলনায় বীজগণিত বা দর্শনের মতো দীর্ঘসময় ধরে যুক্তি দিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করতে হয় এমনসব প্রশ্নের ক্ষেত্রে এআই ছয় গুণ বেশি কার্বন নিঃসরণ করে বলে ব্রিটিশ দৈনিক ইন্ডিপেন্ডেন্ট জানিয়েছে।
গবেষণার প্রধান লেখক ম্যাক্সিমিলিয়ান ডাউনার বলেছেন, “প্রশিক্ষিত লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলকে প্রশ্ন করার ফলে পরিবেশের ওপর যে প্রভাব পড়ে তা মূলত নির্ভর করে এরা কীভাবে যুক্তি ব্যবহার করে তার ওপর। বিশেষ করে, স্পষ্টভাবে যুক্তি বিশ্লেষণ করে উত্তর দেওয়ার বেলায় অনেক বেশি শক্তি ব্যবহার করে এআই। ফলে কার্বন নিঃসরণও ব্যাপকহারে বেড়ে যায়।” তিনি আরও যোগ করেন, “আমরা দেখেছি, যুক্তিভিত্তিক বিভিন্ন মডেল সংক্ষিপ্ত উত্তর দেওয়া মডেলের তুলনায় প্রায় ৫০ গুণ বেশি কার্বন ডাইঅক্সাইড নির্গত করে পরিবেশে।”
ব্যবহারকারী যখন এআই চ্যাটবটকে কোনো প্রশ্ন করেন, তখন সেই প্রশ্নের শব্দ বা শব্দের অংশগুলোকে এআই সংখ্যার একটি সারিতে রূপান্তর করে, যাকে ‘টোকেন’ বলা হয়। এরপর মডেল তা প্রক্রিয়া করে উত্তর তৈরি করে। এই রূপান্তর এবং অন্যান্য কম্পিউটার প্রক্রিয়াকরণের কাজ করতে গিয়ে বাতাসে কার্বন ডাইঅক্সাইড নির্গত হয়, যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।
গবেষণায় বলা হয়েছে, যুক্তিভিত্তিক মডেল গড়ে একটি প্রশ্নের উত্তরে ৫৪৩.৫টি টোকেন তৈরি করে, যেখানে সংক্ষিপ্ত উত্তর দেওয়া বিভিন্ন মডেলের বেলায় প্রয়োজন হয় কেবল ৪০টি টোকেন। গবেষকরা বলছেন, “যত বেশি সংখ্যক টোকেন ব্যবহার হয়, তত বেশি পরিমাণে পরিবেশে কার্বন ডাইঅক্সাইড নিঃসরণ করে এআই।”
উদাহরণস্বরূপ, ‘কোজিটো’ (Cogito) নামের একটি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য মডেল, যা ৮৫ শতাংশ সঠিক উত্তর দেয়, তা একই রকমের অন্যান্য মডেলের চেয়ে তিন গুণ বেশি কার্বন গ্যাস পরিবেশে ছাড়ে। এর কারণ হলো, এটি জটিল প্রশ্ন বিশ্লেষণ করে বড় আকারে উত্তর দেয়, ফলে বেশি টোকেন ব্যবহার হয়।
নির্ভুলতা বনাম পরিবেশ সুরক্ষা:
ড. ডাউনার মন্তব্য করেছেন, “বর্তমানে আমরা স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছি, এখনকার বিভিন্ন লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের সঠিক উত্তর দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ালে পরিবেশের ক্ষতি বাড়বে, অর্থাৎ নির্ভুলতা ও পরিবেশ রক্ষার মধ্যে একটি বোঝাপড়ার বিষয় রয়েছে।” তিনি আরও জানান, যেসব মডেল ৫০০ গ্রাম পরিমাণ কার্বন ডাইঅক্সাইড পরিবেশে নিঃসরণ করে, সেগুলোর কোনোটিই এক হাজারটি প্রশ্নের মধ্যে ৮০ শতাংশের বেশি সঠিক উত্তর দিতে পারেনি।
গবেষকরা বলছেন, এই নতুন তথ্যগুলো মানুষকে তাদের এআই ব্যবহারের বিষয়ে আরও সচেতন এবং পরিবেশবান্ধব সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে। তারা উদাহরণস্বরূপ বলেছেন, ডিপসিক (DeepSeek) বা ওয়ান চ্যাটবটকে (One Chatbot) ৬ লাখ প্রশ্ন করলে যে পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ হবে, তা লন্ডন থেকে নিউ ইয়র্ক পর্যন্ত গিয়ে আবার ফিরে আসার একটি বিমানের যাত্রার সমান হতে পারে। এর বিপরীতে, চীনের আলিবাবা ক্লাউডের ‘কুয়েন ২.৫’ (Qwen 2.5) এআই মডেল একই নির্ভুলতার হার বজায় রেখে তিন গুণের বেশি প্রশ্নের উত্তর দিলেও পরিবেশে এর কার্বন নিঃসরণের হার একই থাকে।
এআই প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে সাথে এর পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে এই গবেষণা এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার জন্ম দিয়েছে, যা ভবিষ্যতের এআই ডিজাইন এবং ব্যবহারের পদ্ধতিকে প্রভাবিত করতে পারে।