বিশেষ: গ্রহাণু পৃথিবীতে আছড়ে পড়লে ঠেকাবে কে? দায়িত্ব কার?, জেনেনিন কী বলছে বিজ্ঞনীরা?

মহাকাশ থেকে ছুটে আসা কোনো গ্রহাণুর পৃথিবীতে আঘাত হানার ঘটনাকে এতদিন বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি মনে হলেও, বিশেষজ্ঞরা এখন এটিকে এক বাস্তব এবং ভয়ংকর হুমকি হিসেবে দেখছেন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই ধরনের বিপদ মোকাবিলার জন্য এখনও বিশ্ব পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। সম্প্রতি ‘সুইনবার্ন ইউনিভার্সিটি’র একটি নতুন গবেষণা এই জটিল নীতিগত, আইনি ও রাজনৈতিক বিষয়গুলো তুলে ধরেছে, যা ভবিষ্যত মহাকাশ প্রতিরক্ষা প্রচেষ্টায় বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে।

এ বছরের শুরুতে ‘২০২৪ ওয়াইআর৪’ নামের এক গ্রহাণু চিহ্নিত হয়েছিল, যার ২০৩২ সালে পৃথিবীতে আঘাত হানার ঝুঁকি ছিল ১ থেকে ২ শতাংশ। যদিও নতুন তথ্য বলছে, এই গ্রহাণুটির পৃথিবীতে আছড়ে পড়ার কোনো ঝুঁকি নেই, তবে এই ঘটনা আবারও বিশ্বকে ভাবিয়ে তুলেছে: ভবিষ্যতে যদি সত্যিই কোনো প্রাণঘাতী গ্রহাণু পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসে, তখন কী হবে? এই বিশাল দায়িত্ব কে নেবে?

অগোছালো নীতি ও নেতৃত্বের অভাব:

‘অ্যারোস্পেস’ জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণার প্রধান লেখক ও সুইনবার্ন ইউনিভার্সিটির বায়োএথিসিস্ট ড. এভি কেনডাল বলেছেন, তারা এমন এক অনিশ্চিত অবস্থায় কাজ করছেন, যেখানে গ্রহাণু নিয়ে কাজ করার জন্য কোনো স্পষ্ট নিয়মকানুন বা নেতৃত্ব নেই। তিনি উল্লেখ করেছেন, বিভিন্ন কোম্পানি ও দেশ গ্রহাণু থেকে মূল্যবান খনিজ সংগ্রহে আগ্রহ দেখালেও, মহাকাশের সম্পদের মালিকানা, এসব সম্পদের ওপর কর আরোপের পদ্ধতি, বা সম্পদ খননকারীদের নিরাপত্তার মতো বিষয়ে এখনও কোনো স্পষ্ট আইন নেই।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, মহাকাশ ও পৃথিবী উভয় ক্ষেত্রেই দস্যুতা, কর্পোরেট লোভ এবং পরিবেশের ক্ষতি এড়িয়ে চলার বিষয়টি। ড. কেনডাল জোর দিয়ে বলেছেন, পৃথিবীকে আসন্ন গ্রহাণুর আঘাত থেকে রক্ষার জন্য এই বিষয়গুলো বিশেষভাবে জরুরি।

ডার্টি মিশন: আশার আলো কিন্তু চ্যালেঞ্জও:

২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা’র ‘ডার্টি’ (DART) মিশনে ‘ডিডিমোস’ নামের এক উল্কাপিণ্ডকে সফলভাবে ধাক্কা দিয়ে সেটিকে তার পথ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ইলন মাস্কের কোম্পানি স্পেসএক্সের সহযোগিতায় তৈরি একটি মহাকাশযান এই কাজটি সম্পন্ন করে। এটি ছিল পৃথিবীর প্রথম বাস্তব পরীক্ষা, যা ইঙ্গিত দেয় যে, কীভাবে বিপজ্জনক মহাকাশ পাথরকে পৃথিবীতে আঘাত হানা থেকে থামানো যেতে পারে।

এই মিশন বিজ্ঞানীদের মধ্যে আশা জাগিয়েছিল যে, ভবিষ্যতে কোনো প্রাণঘাতী উল্কাপিণ্ডের পথ পরিবর্তন করা সম্ভব। কিন্তু ড. কেনডাল সতর্ক করে বলছেন, এক্ষেত্রে কেবল একটি দলের ওপর নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ, বিশেষ করে যখন রাজনীতি বা অর্থায়নের মতো সমস্যা জড়িয়ে রয়েছে। তিনি বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও স্পেসএক্সের প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্কের মধ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনা এবং নাসার বাজেটে কাটছাঁটের কারণে সংস্থাটির সক্ষমতা সীমিত হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তার মতে, এসব জটিলতা সত্যিকারের হুমকির বিরুদ্ধে দ্রুত সাড়া দিতে বিজ্ঞানীদের দুর্বল করে দিতে পারে।

স্পষ্ট নীতিমালা ও আন্তর্জাতিক চুক্তির প্রয়োজনীয়তা:

বর্তমানে, পৃথিবী সুরক্ষার দায়িত্ব সমন্বয়ের জন্য জাতিসংঘ সমর্থিত ‘স্পেস মিশন প্ল্যানিং অ্যাডভাইসরি গ্রুপ’ বা এসএসপিএজি (SMPAG) কাজ করছে। তবে ড. কেনডালের অনুমান, এই ব্যবস্থা সব সময় ঠিকমতো কাজ করবে না, বিশেষ করে সবচেয়ে জরুরি সময়ে।

এর বদলে তিনি পৃথিবী রক্ষার জন্য স্পষ্ট নীতিমালা এবং আন্তর্জাতিক চুক্তির কথা বলেছেন। এসব নীতিমালা ঠিক করে দেবে কে কী করবে, কে অর্থায়ন করবে এবং সংকটের সময় চূড়ান্ত কর্তৃত্ব কার হাতে থাকবে। এক্ষেত্রে তিনি ‘ডোন্ট লুক আপ’ (Don’t Look Up) সিনেমাটিকে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যেখানে একটি গুরুতর গ্রহাণুর হুমকিকে মানুষ নিজেদের লাভের জন্য উপেক্ষা করেছিল। সিনেমাটি কাল্পনিক হলেও এর বার্তাটি সত্য; কারণ স্পষ্ট নিয়ম না থাকলে ভালো উদ্দেশ্যও দ্রুত ব্যর্থ হতে পারে।

ড. কেনডাল বলেছেন, এখন সময় এসেছে অপ্রকাশিত বা অস্পষ্ট চুক্তির বাইরে গিয়ে মহাকাশ নীতিমালা নিয়ে গুরুত্ব সহকারে কথা বলার, বিশেষ করে যখন মহাকাশ খনন এবং প্রতিরক্ষা মিশনগুলো আরও সাধারণ বিষয় হয়ে উঠছে। বিপদ ঘটার পর চিন্তা করা শুরু করলে অনেক দেরি হয়ে যেতে পারে – এই ছিল তার চূড়ান্ত সতর্কবার্তা।