“আমি জানি, তুলসীগাছ কোথায় বসাতে হয়”-কেন একথা বললেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা?

মহেশতলার সাম্প্রতিক হিংসাত্মক ঘটনাপ্রবাহ থেকে বাংলার রাজনীতিতে নতুন করে যে শব্দটি ঝড় তুলেছে, তা হলো ‘তুলসী গাছ’। একদা ভক্তি ও পবিত্রতার প্রতীক এই নিরীহ উদ্ভিদটি এখন রাজ্য রাজনীতির নতুন ‘হট টপিক’। অভিযোগ উঠেছে, মহেশতলায় একটি তুলসী মঞ্চ স্থাপনকে কেন্দ্র করেই নাকি যাবতীয় গোলমালের সূত্রপাত। আর এই ‘তুলসী-বিতর্ক’কে হাতিয়ার করে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসকে তুলোধোনা করতে নেমেছে প্রধান বিরোধী দল বিজেপি। পরিস্থিতি এমন যে, খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পর্যন্ত নবান্নে সাংবাদিক সম্মেলন করে তুলসী গাছ নিয়ে নিজের ‘বিশেষ জ্ঞান’ জাহির করতে হয়েছে। তাঁর সোজাসাপ্টা মন্তব্য: “আমার বাড়িতে ৪০টি তুলসীগাছ আছে। আমি জানি, কোথায় তুলসী বসাতে হয়।”

মহেশতলার ঘটনার পর থেকেই বিজেপির আক্রমণের মূল সুর হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘তুলসী অবমাননা’। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী তো রীতিমতো তার এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলের প্রোফাইল ছবি বদলে তুলসী মঞ্চের ছবি দিয়ে দিয়েছেন। বিধানসভাতেও গেরুয়া শিবির ‘তুলসী গাছের অবমাননা’ হচ্ছে দাবি করে সরব হয়েছে। বিজেপির মূল অভিযোগ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘সংখ্যালঘু তোষণের’ ফলেই হিন্দুদের পবিত্র তুলসী গাছকে অসম্মান করা হচ্ছে। কিছুদিন আগে বিজেপি বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পাল অভিযোগ করেন, বিধানসভায় ঢোকার সময় বিজেপি বিধায়কদের গাড়ি তল্লাশি করা হচ্ছে, যা নাকি ‘তুলসী গাছ নিয়ে কেউ যেন বিধানসভায় না ঢোকে’ সেই উদ্দেশ্যেই করা হচ্ছে – এমনটাই তার দাবি।

রাজনীতির এই নয়া মোড় যেন বুঝিয়ে দিচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গের মাটি থেকে এবার আধ্যাত্মিকতার মোড়কে মেরুকরণের এক নতুন ধারা বইতে শুরু করেছে। যেখানে একটি সাধারণ তুলসী গাছও হয়ে উঠছে ভোট টানার হাতিয়ার।

মমতার ‘৪০টি তুলসী গাছ’ এবং শুভেন্দুকে সূক্ষ্ম খোঁচা

এহেন পরিস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রীর ‘৪০টি তুলসী গাছ’-এর পরিসংখ্যান এক ভিন্ন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তিনি যে শুধুমাত্র একজন ধার্মিক ব্যক্তি তা প্রমাণ করাই হয়তো এর উদ্দেশ্য ছিল না। তুলসী গাছ নিয়ে বিজেপি’র অতি-উৎসাহকে কটাক্ষ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আরও বলেন, “তুলসী কয় রকমের হয় জানেন? তুলসীর মধ্যে লক্ষ্মীও আছে, নারায়ণও আছে। সব জায়গায় তুলসী গাছ লাগানো যায় না, সম্মানের সঙ্গে লাগাতে হয়। আমরা শ্রীকৃষ্ণকে তুলসী দিই, জগন্নাথকে তুলসী দিই।”

এরপর শুভেন্দু অধিকারীর নাম না করেই মুখ্যমন্ত্রীর ধারালো প্রশ্ন, “আপনি নিজের বাড়িতে তুলসী গাছ লাগালেন না কেন? এভাবে দেবতাদের অসম্মান করা হয়, এগুলো অন্যায়। আজ দুর্গাপুজোর সময় অনেকে দেশের বাড়িতে যান। তাই বলে কি তার বাড়িটা আমি দখল করে নিতে পারি?” মমতার এই মন্তব্য স্পষ্টতই শুভেন্দুর ‘এক্স’ প্রোফাইল পিকচার বদলানো এবং ‘তুলসী মঞ্চ’ নিয়ে বিজেপির অতি-সক্রিয়তাকে নিশানা করেছে।

সব মিলিয়ে, বাংলার রাজনীতিতে ধর্মীয় প্রতীকগুলির ব্যবহার যেন ক্রমশ বাড়ছে। একসময় দুর্গাপূজা, সরস্বতী পূজা নিয়ে বিতর্ক ছিল। এখন সেই তালিকায় যোগ হয়েছে তুলসী গাছ। প্রশ্ন উঠছে, পবিত্রতার এই প্রতীকগুলি কি সত্যিই ধর্মপ্রাণ মানুষের আবেগকে প্রতিফলিত করছে, নাকি শুধুই রাজনৈতিক ফায়দা তোলার নতুন কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে? আগামী দিনে এই ‘তুলসী-যুদ্ধ’ বাংলার রাজনৈতিক সমীকরণকে আরও কতদূর নিয়ে যায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।