“ভাই পারেনি, আমাকে বাঁচাল ওই দরজাটাই!”- এখনো আতঙ্কের ঘোর কাটেনি রমেশের

বৃহস্পতিবার আহমেদাবাদে বিধ্বস্ত এয়ার ইন্ডিয়ার ড্রিমলাইনার AI171-এর একমাত্র জীবিত যাত্রী বিশ্বাসকুমার রমেশ এখন দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। বিমান দুর্ঘটনার ভয়াবহতা থেকে একজন যাত্রীর প্রায় অক্ষত অবস্থায় বেঁচে যাওয়া ইতিহাসে বিরল না হলেও, রমেশের অভিজ্ঞতা যেন এক অলৌকিক উপাখ্যান। ১ লক্ষ ২৫ হাজার লিটার হাই অক্টেন জ্বালানি তেল নিয়ে ২৪২ জনকে বহনকারী প্লেনটি টেক অফের কয়েক সেকেন্ড পরেই যখন আছড়ে পড়ে, তখন তার প্রায় অক্ষত অবস্থায় বেঁচে থাকা সত্যিই তাকে ‘ভাগ্যের বরপুত্র’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

মৃত্যুর গ্রাস থেকে ভাগ্যের জোরে বেরিয়ে আসার কয়েক ঘণ্টা পর আহমেদাবাদ সিভিল হাসপাতালে শুয়ে শুক্রবার রমেশ সংবাদমাধ্যমকে তার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানান। এদিন দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এরপর তিনি হাসপাতালে ছুটে যান বিমান দুর্ঘটনার একমাত্র জীবিত যাত্রীর সঙ্গে দেখা করতে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী বিশ্বাসকুমারের সঙ্গে কথা বলে তার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ নেন এবং দুর্ঘটনার সময়কার ঘটনাপরম্পরা জানতে চান।

কেমন ছিল সেই অভিশপ্ত মুহূর্ত?
বিমান যাত্রীরা কি আদৌ কিছু বুঝতে পেরেছিলেন তাদের ঘনিয়ে আসা ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে? এই প্রশ্ন এখন গোটা দেশের। এর উত্তর দিতে পারেন মাত্র একজনই — তিনি বিশ্বাসকুমার রমেশ।

বৃহস্পতিবার অ্যাম্বুল্যান্সে ওঠার আগে রমেশ জানিয়েছিলেন, প্লেনটি টেক অফ করার পরপরই একটা বিস্ফোরণের শব্দ হয়, এরপর তার আর কিছু মনে নেই। শুক্রবার হাসপাতালে রমেশকে আবারও প্রশ্ন করে একাধিক সংবাদমাধ্যম। জবাবে রমেশ বলেন, “প্লেনটি মাটি ছাড়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আমি বুঝেছিলাম, কোথাও একটা গোলমাল হচ্ছে। প্লেনটি যেন হাওয়ায় আটকে আটকে যাচ্ছিল। এর পরেই হঠাৎ প্লেনের মধ্যেকার সবুজ ও সাদা আলো জ্বলতে নিভতে শুরু করে। কী হচ্ছে, কিছু বুঝতে পারার আগেই প্লেনটির সঙ্গে কিছুর ভয়ানক ধাক্কা লাগে।”

১১এ বনাম ১১জে: ভাগ্য ও মর্মান্তিক পরিণতি
ধাক্কার অভিঘাতে বিশ্বাসকুমার প্রথমে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তার জ্ঞান ফিরে আসে। সেই সময়েই তিনি নিজের সামনে বাঁদিকে একটি ইমার্জেন্সি এগজিট দেখতে পান। তিনি বলেন, “আমার পাশের দরজাটা মাটির কাছে ছিল। কিন্তু অন্য দিকের দরজাটা একটা বড় বাড়ির দেওয়ালের উপরে ছিল। আমি ওই দিকে থাকলে বেরোতে পারতাম না।” দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বিশ্বাসকুমারের ভাই ১১-জে সিটে, অর্থাৎ বিজনেস ক্লাসের পরে যেখানে ইকোনমি ক্লাস শুরু হচ্ছে, তার প্রথম সারিতেই বসেছিলেন। তার দিকের ইমার্জেন্সি এগজিটটি জেবি মেডিক্যাল কলেজের হস্টেলে বিমানটি ধাক্কা মারার পর দেওয়ালে আটকে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

রমেশের কথা অনুযায়ী, তিনি কোনো রকমে নিজেকে বাঁ দিকের ইমার্জেন্সি এগজিটের দিকে টেনে নিয়ে যান। এই সময়েই বাইরের আগুনের হলকায় তার একটি হাত কিছুটা পুড়ে যায়। নিজেকে প্লেন থেকে বের করার সময় রমেশ তার চারপাশে দুজন এয়ার হস্টেস-সহ বেশ কয়েকজন যাত্রীর মৃতদেহ দেখতে পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন।

“কীভাবে বাঁচলাম, নিজেই বুঝতে পারছি না”:
নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে এইভাবে ফিরে আসা! এই পরিস্থিতিতে নিজের সম্পর্কে কী মনে হচ্ছে? এমন প্রশ্নের জবাবে মৃত্যুঞ্জয়ী বিশ্বাসকুমার রমেশ বলেন, “আমি নিজেই বুঝতে পারছি না, কীভাবে বাঁচলাম। মনে হয়েছিল মরেই গিয়েছি। চোখ খোলার পরে দরজা দিয়ে আলো আসতে দেখে বুঝেছিলাম মরিনি। ওই দরজাটাই বাঁচালো আমাকে।”

বিশ্বাসকুমার রমেশের এই রোমহর্ষক অভিজ্ঞতা আহমেদাবাদ বিমান দুর্ঘটনার ভয়াবহতা এবং একই সঙ্গে ভাগ্যের অবিশ্বাস্য লীলা নতুন করে ফুটিয়ে তুলল।