বিশেষ: ধনী হতে চাইলে এই ১৪টি অভ্যাস আজই ত্যাগ করুন, পড়েনিন বিস্তারিত (২য় পর্ব )

আপনি কি ধনী হতে চান? – ধনী হতে চাইলে এই লেখার প্রতিটি পয়েন্ট খুব মন দিয়ে পড়ুন। না – আমরা সরাসরি আপনাকে ধনী হওয়ার উপায় বলব না। কিন্তু ধনী হওয়ার যাত্রা শুরু করতে প্রথমেই এই বিষয়গুলোর প্রতি নজর দেয়া জরুরী।

ভালো অভ্যাস করার আগে যেমন আগের খারাপ অভ্যাসগুলো বাদ দেয়া জরুরী, তেমনি ধনী হতে চাইলে – যেসব অভ্যাস আপনাকে ধনী হতে দেবে না, সেগুলো বাদ দেয়া জরুরী।

আজ আপনাকে যে অভ্যাসগুলোর কথা বলব, সেগুলো আসলে ধনী না হওয়ার চিহ্ন। এগুলো প্রায় সব সাধারণ মানুষের মাঝে দেখা যায়। সবগুলো না হলেও এসব অভ্যাসের কিছু না কিছু সব সাধারণ মানুষের মধ্যেই আছে। এবং এর কিছু এতই সাধারণ যে, না বলে দিলে বোঝাও যায় না এগুলো আপনার ধনী হওয়ার ইচ্ছাকে গোপনে গলা টিপে মারছে।

কাজেই, আপনি যদি ধনী হতে চান, তবে খুব মন দিয়ে প্রতিটি পয়েন্ট পড়ুন এবং ভালো করে ভাবুন যে, এগুলোর কোনওটা আপনার মধ্যে আছে কিনা। যদি থাকে – তবে আজ থেকেই সেগুলো দূর করার কাজে নেমে পড়ুন। আজ থেকেই আপনার জীবন বদলাতে শুরু করবে। গতকাল যদি আপনার ধনী হওয়ার সম্ভাবনা হয় ১০, তাহলে আজই সেই সম্ভাবনা হয়ে যেতে পারে ৫০ এরও বেশি। চলুন তাহলে, আর দেরি না করে জেনে নিই ধনী হতে চাইলে কি কি অভ্যাস আপনাকে বাদ দিতে হবে।

ধনী হতে চাইলে যে ১৪টি অভ্যাস বাদ দিতে হবে:
মূল পয়েন্টগুলো বর্ণনা করার আগে আপনাকে ছোট্ট একটা সারাংশ দিয়ে রাখি, তাহলে ব্যাপারগুলো ভালোভাবে অনুধাবন করতে আপনার সুবিধা হবে:

ধনী হওয়ার জন্য আপনাকে কয়েকটি জিনিস নিজের ভেতরে এক করতে হবে: বুদ্ধি, যোগাযোগ দক্ষতা, শৃঙ্খলা ও আত্ম নিয়ন্ত্রণ, মনোযোগ, এ্যানালাইসিস, এবং ভবিষ্যতের কথা ভেবে বর্তমানে ত্যাগ স্বীকার করার মানসিকতা।

মূল পয়েন্টগুলো পড়তে পড়তে এই বিষয়গুলোর সাথে ধনী হওয়ার সম্পর্ক নিয়ে ভাবতে থাকুন। পড়া শেষ হলে আপনি নিজেই অনেক কিছু বুঝতে পারবেন।

এখন জেনে নেয়া যাক সেই ১৪টি ধনী না হওয়ার চিহ্নর ২য় পর্ব –

০৮. আপনি মনে করেন যে, পরিশ্রম নয়, ভাগ্যই ধনীদের ধনী করে
আপনার মাঝে যদি এই মানসিকতা থাকে, তবে আপনি জীবনে আর যাই হোন ধনী হতে পারবেন না। এটা আসলে পরিশ্রম না করার একটা অজুহাত।

অনেকে বলেন, ধনী হতে হলে ধনী হয়ে জন্মাতে হয়, অথবা কারও সাহায্য পেতে হয়। কিন্তু সত্যি কথা হল, আপনি যতক্ষণ না নিজে কিছু করে দেখাতে পারছেন – ততক্ষণ আপনাকে কেউ সাহায্য করবে না।

ভারতীয় হিসেবে সবচেয়ে কম বয়সে বিলিওনেয়ারের খাতায় নাম লেখানো বিজয় শেখর শর্মা এক সময়ে না খেয়ে দিন কাটাতেন। বাড়িওয়ালার কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াতেন। শুধু চা আর পানি খেয়ে রাতের পর রাত পার করেছেন। কিন্তু এত কষ্ট করে যখন তিনি দেখানোর মত কিছু একটা দাঁড় করাতে পেরেছেন – তখনই তাঁর সাহায্যে বিনিয়োগকারীরা এগিয়ে এসেছেন। আজ তিনি প্রায় ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মালিক। আলিবাবা প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক মার জীবনী থেকে জানা যায়, তিনি একদমই হতদরিদ্র এবং ব্যর্থ অবস্থা থেকে আজকের বিশ্বের সেরা একজন ধনী হয়েছেন। মিডিয়া মোগল বিলিওনেয়ার অপরাহ উইনফ্রে ছিলেন কৃষি খামারে আশ্রিত ও অত্যাচারিত।

এঁরা যদি ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে থেকে পরিশ্রম না করতেন – তবে কেউই এতটা ধনী আর সফল হতে পারতেন না। এমনকি বেশিরভাগ ধর্মেও বলা আছে যে, নিজে চেষ্টা না করলে সৃষ্টিকর্তাও সাহায্য করেন না।

কাজেই, নিজের চেষ্টায় ধনী হতে চাইলে আপনাকে অবশ্যই পরিশ্রম করতে হবে। এই লেখাটি পড়ছেন, মানে আপনি পৃথিবীর সেই সৌভাগ্যবানদের একজন, যার হাতে ইন্টারনেট ও এমন একটি ডিভাইস আছে – যা দিয়ে আপনি যে কোনও কিছু শিখতে পারবেন। শুধুমাত্র একটি ইন্টারনেট কানেকশন থাকলে আজ নিজের চেষ্টায় অনেক কিছু করা যায়।

আপনার বর্তমান আর্থিক অবস্থা যা-ই হোক না কেন, সঠিক ভাবে পরিকল্পনা ও পরিশ্রম করলে ৫ বছরের মধ্যে আপনার অবস্থা ঘুরে যাবে। ৫ বছরের বেশি কোনওভাবেই লাগার কথা নয়।

সঠিক পথে পরিশ্রম করলে আপনি যতটা আশা করছেন, তারচেয়েও তাড়াতাড়ি আপনি ধনী হতে পারবেন। কাজেই সৌভাগ্যের আশায় বসে না থেকে নিজের ভাগ্য নিজে গড়তে শুরু করুন।

০৯. আপনি নিজের দোষ দেখেন না
আপনার জীবনে খারাপ কিছু ঘটলেই যদি আপনি নিজের ভুল কোথায় হয়েছে – তা খোঁজার বদলে অন্যের ওপর দোষ চাপানোর পথ খোঁজেন – তাহলে নিজের চেষ্টায় ধনী হওয়ার কথা ভুলে যান।

এই স্বভাব যাদের মাঝে আছে, তারা আসলে দায়িত্ব নিতে পারে না। আপনার যদি একটা ব্যবসা থাকে, এবং ব্যবসায় লস হলে আপনি নিজের ভুল না খুঁজে অন্যের দোষ খুঁজতে থাকেন – তাহলে সেই অবস্থা থেকে জীবনেও বের হতে পারবেন না।

কোনও সমস্যার সমাধান যদি খুঁজে না পান – তবে নিজের দিকে তাকান। হয়তো সমস্যাটা আপনার নিজের। মার্কেটে আপনার নতুন পন্য বা সার্ভিস চালাতে পারছেন না – এটা কখনওই মার্কেটের দোষ নয়। আপনি আপনার পন্য বা সেবা ঠিকমত প্রচার করতে পারছেন না, অথবা আপনার প্রোডাক্টে কোনও ত্রুটি আছে।

বেশিরভাগ মানুষ এটা করতে চায় না, কারণ এতে নিজের চোখে নিজের অনেক ত্রুটি ধরা পড়ে। মানুষ নিজের সামনে দাঁড়াতে ভয় পায়। আপনার ব্যবসায় লাভ হচ্ছে না, কারণ আপনি এখনও ভালোকরে ব্যবসা বোঝেননি। আপনার পন্য মানুষ কিনছে না, কারণ আপনার পন্যে সমস্যা আছে। সাধারণ মানুষ এসব নিয়ে চিন্তা করতে চায় না। কিন্তু আপনি যদি সাধারণ মানুষের মত আচরণ করেন, তবে কখনওই অসাধারণ হতে পারবেন না।

কাজেই, কোনওকিছু ঘটলে সবার আগে নিজের দিকে তাকান। আপনার নিজের কোথায় ভুল হয়েছে – তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করুন। তাহলেই এক সময়ে আর ভুল করবেন না।

১০. আপনি নতুন জিনিস শেখা বন্ধ করে দিয়েছেন
সময়ের সাথে যদি নিজেকে আপডেট করতে না পারেন, তবে যেখানে আছেন – সেখানেই সারাজীবন থেকে যাবেন।

আপনার জ্ঞান ও দক্ষতা যদি সামনের ৫ বছর একই রকম থাকে, তবে সামনের ৫ বছর আপনার আর্থিক অবস্থাও এমনই থাকবে।

বেশিরভাগ মানুষ তাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ হয়ে গেলে ভাবে তাদের শেখা শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু তখন থেকেই আসলে সত্যিকার শেখা শুরু হয়। আপনি যদি মাস্টার্স বা অনার্স শেষ হওয়ার পর পড়াশুনা করা বন্ধ করে দেন – তাহলে হয়তো একটা ভালো চাকরি বা আয়ের রাস্তা পেয়ে যাবেন। কিন্তু নতুন জ্ঞান আর দক্ষতা অর্জন না করলে আপনার আয়ও একটা পর্যায়ে এসে থেমে যাবে।

আমরা এখানে নিজের চেষ্টায় ধনী হওয়ার কথা বলছি। অবশ্যই অবৈধ উপায়ে বা ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে বড়লোক হওয়ার কথা বলছি না। ওইসব পথে ধনী হওয়ার মাঝে কোনও মহত্ব নেই। যাঁরা নিজের চেষ্টায় স‌ৎ পথে থেকে ধনী হয়েছেন – তাঁরা পরিশ্রম করেই ধনী হয়েছেন। পরিশ্রমের সাথে তাঁরা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন বিষয় শিখে নিজেদের আপডেট করেছেন।

মানুষের মাঝে একটা ভুল ধারণা রয়েছে যে, অবৈধ পথে ছাড়া বড়লোক হওয়া যায় না। এই ধারণা আঁকড়ে থাকলে আপনার পক্ষে ধনী হওয়া সম্ভব নয়। স‌ৎ পথে থেকে পরিশ্রম আর আত্ম উন্নয়নের মাধ্যমে আমাদের দেশেই অনেক মানুষ ধনী হয়েছেন। কৃষি খামার করে কোটিপতি হওয়ার উদাহরণ আমাদের দেশেও কম নয়।

সেইসাথে অনেক কৃষক আছেন, যাঁরা দু’বেলা খেতে পান না। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সেই কোটিপতি কৃষকদের শুরুটা হয়েছিল সেই না খেতে পাওয়া কৃষকদের মতই। কিন্তু তাঁরা তাঁদের কাজের বিষয়ে নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করেছেন – এবং সেই শিক্ষাকে কাজে লাগিয়েছেন।

প্রতিটি পেশার ক্ষেত্রেই এই দুই ধরনের লোক পাওয়া যাবে। কেউ কোটি টাকার ওপরে বসে আছে, আর কেউবা দিন চালাতে পারে না। আপনি নিজেকে যত আপডেট করবেন – সামনে থাকা সুযোগগুলোকে তত ভালো করে চিনতে পারবেন পারবেন, এবং সেই সুযোগকে কাজে লাগাতে পারবেন।

আপনি যে ক্ষেত্রেই কাজ করেন না কেন, সেই বিষয়ে প্রচুর বই রয়েছে, সেইসাথে অভিজ্ঞদের কাছ থেকে সরাসরি শিখতে পারেন। কোর্স করতে পারেন। ইন্টারনেটে আজকাল যে কোনও বিষয়ে ফ্রি শেখা যায়। সাধারণ মানুষ যখন গড়ে বছরে একটি বই পড়ে, টপ সিইওরা গড়ে ৫০টি বই পড়েন। ফেসবুক বা ইউটিউবে বিনোদন না করে সেই সময়টা শেখার পেছনে লাগান। একটা সময়ে নিজের উন্নতি আপনি নিজেই টের পাবেন।

নিজের বিষয়ে বই পড়ার পাশাপাশি সফল মানুষদের জীবনী ও তাদের লেখা বই পড়ুন। স্টিভ জবস, বা ইলন মাস্কের মত মানুষদের স্টাডি করুন। জানুন তাঁরা কিভাবে কঠিন সময় পার করেছেন, কিভাবে তাঁরা জীবনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন – এগুলো আপনাকে অনুপ্রাণিত করার পাশাপাশি সফল হওয়ার পথও দেখাবে।

সেলফ ডেভেলপমেন্ট কোচ ব্রায়ান ট্রেসি বলেন, কেউ যদি তার আয়ের মাত্র ৩% নিজের শেখার পেছনে ব্যয় করতে শুরু করে, তবে অল্প দিনের মধ্যেই তার আয় বহুগুণে বাড়তে থাকবে।

আপনার কাজের মান ও ব্যাপ্তি বাড়ার সাথে সাথে আর্থিক অবস্থাও ভালোর দিকে যেতে থাকবে।

১১. আপনি নতুন অভ্যাস গড়ে তুলছেন না
জীবনকে যদি বদলাতে হয়, তবে অভ্যাসও বদলাতে হবে। যদি চান যে, ২০১৮ থেকে ২০১৯ অন্যরকম হোক, তবে আপনার নিজেকেও অন্যরকম হয়ে উঠতে হবে। এবং সেই পরিবর্তনটা হতে হবে ভালো পরিবর্তন।

নিজের অভ্যাস না বদলে আর্থিক অবস্থা বদলের আশা করাটা হবে বোকামী। গত বছর যদি দিনে ৬ ঘন্টা কাজ করে থাকেন, তবে এই বছর আপনাকে ১০ ঘন্টা কাজ করতে হবে।

যদি বলেন, আপনার হাতে সময় নেই, তাহলে ভুল করবেন। সব খেলোয়াড়ই দিনে ২৪ ঘন্টা করে পায়, কিন্তু সবাই ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো হতে পারে না। কারণ, সবাই মাঠ ছেড়ে চলে গেলেও রোনালদো কয়েক ঘন্টা একা একা প্রাকটিস করেন।

আপনি যদি মধ্যবিত্ত বা গরিব অবস্থা থেকে ‘বড়লোক’ এর কাতারে যেতে চান – তবে ৯টা-৫টা মনোভাব মন থেকে ঝেড়ে ফেলুন। অফিসের কাজ শেষে বাসায় ফিরে নিজের কাজ করুন। অথবা সকাল ৮টার বদলে সকাল ৬টায় উঠুন। দেড়-দুই ঘন্টা সময় নিজের স্বপ্নের পেছনে দিন। পড়াশুনা করুন, অথবা কাজ করুন। অফিস থেকে ফিরেও এই কাজ করুন। এই দেড়-দুই ঘন্টা এক্সট্রা সময় একদিন আপনাকে এক্সট্রা অর্ডিনারি বানিয়ে দেবে।

এভাবে আরও যদি বাজে অভ্যাস থাকে, সেই বাজে অভ্যাস পরিবর্তন করে ফেলুন।

নতুন কিছু করার চেষ্টা করুন। নিজেকে নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করুন। কমফোর্ট জোন থেকে নিজেকে বের করার চেষ্টা করুন। যেসব করতে ভয় বা অস্বস্তি লাগে – সেগুলো করার চেষ্টা করুন। আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন করতে হলে আপনাকে আপনার রুটিন ও অভ্যাসও পরিবর্তন করতে হবে।

আরও পড়ুন: যে কোনও বাজে অভ্যাস দূর করার উপায় (মিনি হ্যাবিটস বুক রিভিউ)

১২. আপনি ব্যর্থতাকে অতিরিক্ত ভয় পান
সত্যি বলতে, পৃথিবীতে কেউই ব্যর্থ হতে চায় না। এই কারণেই বেশিরভাগ মানুষ খুব বড় লক্ষ্য ঠিক করতে ভয় পায়। সব সময়ে নিরাপদ থাকতে চায়।

আপনার মাঝে যদি ব্যর্থতার ভয় অতিরিক্ত হয়, তবে আপনিও খুব বড় লক্ষ্যের চিন্তা করার সাহস পাবেন না। বড় লক্ষ্যে ঝুঁকিও বেশি – এটা জেনেই বড় লক্ষ্য অর্জনের কাজ করতে হয়।

আপনি যদি ধনী হতে চান, তবে অনেক নিরাপদ ক্যারিয়ারের হাতছানি আপনাকে অগ্রাহ্য করতে হবে। হয়তো উচ্চ বেতনের সরকারি চাকরির সুযোগও ছাড়তে হবে। কিন্তু আপনাকে নিরাপত্তা আর বিরাট ধনসম্পদের সম্ভাবনার একটি বেছে নিতে হবে। আর সত্যি কথা বলতে, আপনি যদি হাল না ছেড়ে চেষ্টা করে যান – তবে এক সময়ে না এক সময়ে আপনি অবশ্যই সফল হবেন।

আপনার হয়তো মনে হতে পারে, ব্যর্থ হলে যারা নিরাপদ জীবন বেছে নিতে বলেছিল – তাদের সামনে মুখ দেখাতে পারবেন না। কিন্তু আপনি যতক্ষণ না হার মানছেন – ততক্ষণ আপনার সম্ভাবনা আছে। কাজেই ধনী হতে চাইলে ভয়কে দূরে ঠেলেই কাজ করতে হবে।

১৩. আপনি সপ্তাহে ৪৮ ঘন্টা বা তার কম কাজ করেন
১১ নম্বর পয়েন্টে ৯-৫টা কাজ করার কথা বলেছিলাম। এই অভ্যাস যদি আপনার মাঝে থাকে, তবে আপনাকে সারাজীবন মধ্যবিত্ত হয়েই কাটাতে হবে। ধনী হওয়ার প্রথম শর্ত, চাকরিজীবি মনোভাব থেকে বের হয়ে আসতে হবে।

পৃথিবীর যত সফল উদ্যোক্তা বা ধনী ব্যক্তি আছেন, তাঁরা কম পক্ষে সপ্তাহে ৬০ ঘন্টা কাজ করতে অভ্যস্ত। অফিসে একটু বেশি কাজের চাপের কারণে ৮ ঘন্টার বেশি কাজ করতে গিয়ে যদি আপনি বিরক্ত হন – তবে নিশ্চিত ভাবেই আপনি ধনী হওয়ার পথে নেই।

আপনার কোম্পানীতে বড় পর্যায়ে যেতে গেলে, অথবা ব্যবসাকে অনেক বেশি লাভজনক করতে হলে আপনাকে অন্তত কিছুদিন অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হবে। ইলন মাস্ক সপ্তাহে ১০০ ঘন্টারও বেশি কাজ করেন। ধনী মানুষেরা কতটা সময় কাজ করেছেন – সেদিকে মনোযোগ দেয়ার বদলে কতটা কাজ করেছেন – সেদিকে বেশি মনোযোগ দেন। মাইক্রোসফটের শুরুর কয়েক বছর বিল গেটস কাজ করতে করতে টেবিলেই ঘুমিয়ে পড়তেন। ঘুম থেকে উঠে আবার সেখান থেকেই শুরু করতেন।

বড় ব্যবসায়ী হতে হলে আপনাকে অন্তত ২ বছর প্রতি সপ্তাহে ৮০ থেকে ১০০ ঘন্টা কাজ করতে হবে। এর কোনও বিকল্প নেই।

আপনি যে কাজই করেন না কেন, আলস্যকে প্রশ্রয় দেবেন না। কাজের সময়ে মুডকে পাত্তা দেবেন না। না হলে আপনার ধনী হওয়ার স্বপ্ন, স্বপ্নই থেকে যাবে।

আগেও বলেছি, সবাই দিনে ২৪ ঘন্টা পায়। এই সময়ের যতটা আপনি ধনী ও সফল হওয়ার পেছনে ব্যয় করবেন, আপনার ধনী ও সফল হওয়ার সম্ভাবনা ততই বেড়ে যাবে।

১৪. আপনি সময়ের হিসেবে টাকা পেতে চান
পৃথিবীর সব অর্থ তিন শ্রেণীর মানুষের মাঝে ভাগ হয়। একদম নিচে শ্রমিক শ্রেণী। তারা যতটুকু কাজ করে, সেই কাজের বিনিময়ে তারা টাকা পায়। কাজ নেই, টাকাও নেই। এই শ্রেণীর মানুষ কত টাকা পাবে তা সাধারণত তারা কয় ঘন্টা কাজ করেছে, বা কত ইউনিট পন্য তৈরী করেছে – তার ওপর নির্ভর করে। কল কারখানা বা ওয়ার্কশপের সবচেয়ে অদক্ষ শ্রমিকরা এই মডেলে কাজ করে।

এর ওপরে আছে দক্ষ কর্মী ও চাকরিজীবিরা। প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে কর্মক্ষেত্রে উপস্থিত হওয়া ও কাজ করার জন্য এদের একটা নির্দিষ্ট পরিমান টাকা দেয়া হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটা হয় মাসিক বেতন। এছাড়া কাজের ওপরে কিছু বোনাস থাকে। অনেক বেশি পরিমান পরিশ্রম করে শ্রমিক থেকে দক্ষ শ্রমিক ও চাকরিজীবি পর্যায়ে ওঠা যায়। এদের আয়ের পরিমান শ্রমিকদের চেয়ে ভালো। কিন্তু এদেরকেও টাকার জন্য অন্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। যত টাকার কাজই করুক না কেন, একটা নির্দিষ্ট পরিমান অর্থই এরা পায়।

চাকরির বয়স বাড়ার সাথে সাথে এদের সেই আয়ের পরিমান বাড়ে – তবে তারা কখনওই সত্যিকার ধনীর পর্যায়ে যেতে পারে না।

সবচেয়ে ওপরের ভাগে আছে সেইসব মানুষ, যারা বাকি দুই শ্রেণীকে টাকা দিয়ে থাকে। এরা অন্যের জন্য কাজ না করে নিজের জন্য কাজ করে। যখন অন্যকে সার্ভিস দেয়, তখনও তারা নিজের জন্যই কাজ করে। তারা মোট যে টাকা আয় করে, সেই আয় থেকেই তারা অন্যদেরকে টাকা দেয়।

এই ধরনের মানুষরা তাদের আইডিয়া ও দক্ষতা দিয়ে অন্যদের পরিচালনা করে। তাদের সিদ্ধান্তেই অন্যরা চলে। এই ধরনের মানুষরা যে সব সময়ে ব্যবসায়ীই হবেন – তা নয়। কিন্তু এরা নিজেদের এমন পর্যায়ে নিয়ে যান যাতে করে একটা নির্দিষ্ট জিনিস তাদের ছাড়া অচল। এরা সময়ের হিসেবে টাকা পান না, বরং নিজেদের বুদ্ধি, জ্ঞান ও সৃষ্টিশীলতার জন্য পান। মূলত এই ধরনের মানুষরাই ধনী বা বিখ্যাত হন। এরা যে সব সময়ে ব্যবসায়ী হন – তা নয়। অভিনেতা, বেস্ট সেলিং লেখক, শিল্পী, ডিজাইনার – এমন আরও অনেক মানুষ তাঁদের ইউনিক দক্ষতার কারণে ধনী ও বিখ্যাত হয়ে ওঠেন।

বেশিরভাগ মানুষ যে পথে চলে, এরা তার থেকে আলাদা পথে চলেন। তাদের কাজের ধরন ও চিন্তা ভাবনাও আলাদা। জীবনের একটা সময়ে সময়ের হিসেবে টাকা পেলেও নিজেকে উন্নত ও আপডেট করতে করতে তাঁরা এমন একটা জায়গায় চলে আসেন যে, তাদের বিশেষ জ্ঞান ও দক্ষতা আর কারও ভেতরে থাকে না। তাদের মত করে সিদ্ধান্ত নেয়া বা আইডিয়া ভাবার মত মানুষও খুঁজে পাওয়া কষ্ট।

আপনি যদি সময় বা কাজের ইউনিট হিসেবে টাকা আয় করার চিন্তা করেন – তবে আপনি কোনওদিন আর্থিক ভাবে ওপরের সারির মানুষ হতে পারবেন না। আপনাকে চিন্তা করতে হবে সাধারণ মানুষের চিন্তার বাইরে। আপনি যতই কাজ করেন, দিনে ২৪ ঘন্টার বেশি কাজ করতে পারবেন না – যেটা কোনও মানুষের পক্ষেই সম্ভব নয়।

তাই ধনী হতে চাইলে সময়ের হিসেবে কাজ করে টাকা আয়ের বদলে ‘স্পেশাল ওয়ান’ হয়ে ওঠার চেষ্টা করুন। ইউনিক হওয়ার চেষ্টা করুন। তাহলে আপনার বিশেষ জ্ঞান আর দক্ষতা কাজে লাগিয়ে অনেক বেশি আয় করতে পারবেন।

পরিশিষ্ট:
প্রতিটি মানুষই অপার সম্ভাবনা নিয়ে জন্মায়। সবার ভেতরেই প্রতিভা থাকে – এবং প্রতিটি প্রতিভাকেই যদি ঠিকভাবে যত্ন করা হয়, তবে সেটাই মানুষকে চূড়ান্ত সফলতার দিকে নিয়ে যেতে পারে।

যদি আপনার কাছে ধনী হওয়া মানে সফল হওয়া হয়, তবে তা হওয়ার সব গুণই আপনার মাঝে আছে। শুধু সেই গুণগুলোর যত্ন নিতে হবে। আর যেসব অভ্যাস সেইসব গুণের বিকাশে বাধা দিচ্ছে, সেগুলো বাদ দিতে হবে।

এই লেখায় যে অভ্যাস বা চিহ্নের কথা বলা হয়েছে, সেগুলো আপনার ধনী হয়ে ওঠার অভ্যাস সৃষ্টিতে অনেক বেশি বাধা দিচ্ছে।

আপনার মাঝেও গুণ আছে টাকা জমিয়ে সেই টাকা বিনিয়োগ করার। শুধু বাজে খরচের অভ্যাস বাদ দিতে হবে। তেমনি হিসেব না করার অভ্যাস বাদ দিলেই আপনি হিসেবি হয়ে উঠবেন।

ধনী হতে চাইলে তা হওয়া আসলে খুব কঠিন নয়। শুধু প্রয়োজন ধনী না হওয়ার চিহ্নগুলো চিনে নিয়ে সেগুলোকে নিজের জীবন থেকে দূর করে দেয়া। সেই কাজে এই লেখাটি যদি আপনার সামান্য উপকারেও আসে – তাহলেই আমাদের উদ্দেশ্য পূরণ হবে।