“৩৭ বছর আগেও ঘটেছিল মারাত্মক দুর্ঘটনা”-জেনেনিন ‘অভিশপ্ত’ আমেদাবাদ বিমান বন্দরের ঘটনা?

সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, আহমেদাবাদ। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের অন্যতম ব্যস্ত এবং আধুনিক বিমানবন্দরগুলোর একটি। কিন্তু এই বিমানবন্দরই এখন ৩৭ বছরের ব্যবধানে দেশের দুটি ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনার নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা এর ইতিহাসের পাতায় গভীর কালো ছাপ রেখে গেল। ১৯৮৮ সালের ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ১১৩-এর মর্মান্তিক অবতরণ দুর্ঘটনা এবং বৃহস্পতিবারের এয়ার ইন্ডিয়ার AI 171 ফ্লাইটের বিধ্বংসী উড়ান-পরবর্তী বিপর্যয় – দুটি ঘটনাই আহমেদাবাদের বুকে এঁকে দিয়েছে এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডির দাগ।
১৯৮৮ সালের বিভীষিকা: যখন কুয়াশা গ্রাস করেছিল ১৩৩টি প্রাণ
১৯৮৮ সালের ১৯শে অক্টোবর। মুম্বাই থেকে আহমেদাবাদের উদ্দেশে রওনা দেওয়া ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ১১৩-এর যাত্রীরা তখনও জানতেন না, কী ভয়ংকর পরিণতি অপেক্ষা করছে তাদের জন্য। ক্যাপ্টেন ও.এম. দাল্লায়া এবং ফার্স্ট অফিসার দীপক নাগপালের নেতৃত্বে বিমানটি নির্ধারিত সময়ের ২০ মিনিট পর, সন্ধ্যা ৫টা ৪৫ মিনিটে মুম্বাই বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়ন করে। আহমেদাবাদের উদ্দেশে যাত্রা ছিল স্বাভাবিক।
সমস্যা শুরু হয় অবতরণের ঠিক আগে। ভোরবেলার কুয়াশায় রানওয়ের দৃশ্যমানতা ছিল অত্যন্ত কম। ৬টা ২০ মিনিটে আহমেদাবাদ কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে যোগাযোগ করে ফ্লাইট ক্রু। কন্ট্রোল রুম থেকে জানানো হয়, রানওয়ের আশেপাশে কুয়াশা রয়েছে এবং বাতাসের গতি অনুযায়ী নিকটবর্তী কিছু চিমনির ধোঁয়াও উপরের স্তরে ভাসছে। পাইলটদের ১৭০০ ফুট উচ্চতায় যোগাযোগ করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায় এক মর্মান্তিক ভুল। ফ্লাইটের উচ্চতা কমতে থাকলে পাইলট রানওয়ে খোঁজার চেষ্টা করেন, কিন্তু সে সময় মাটির সঙ্গে বিমানের উচ্চতার দিকে খেয়াল রাখতে পারেননি। কন্ট্রোল রুম থেকে অবতরণের জন্য ক্লিয়ারেন্স না দেওয়া সত্ত্বেও বিমানটি দ্রুত ভূপৃষ্ঠের দিকে নামতে থাকে। সন্ধ্যা ৬টা ৫৩ মিনিটে, রানওয়ে থেকে মাত্র ২.৫৪ কিলোমিটার দূরে একটি গাছে গিয়ে সজোরে ধাক্কা মারে ফ্লাইটটি। সেই ফ্লাইটে ১২৯ জন যাত্রী এবং ৬ জন ক্রু মেম্বার ছিলেন। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ১৩৫ জনের মধ্যে ১৩৩ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়, যা দেশের অন্যতম ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনা হিসেবে লিপিবদ্ধ আছে।
২০২৫-এর ট্র্যাজেডি: মে-ডে কল এবং তারপর নীরবতা
বৃহস্পতিবার, ১২ই জুন, ২০২৫। আহমেদাবাদ থেকে লন্ডনের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছিল এয়ার ইন্ডিয়ার AI 171 বিমান। নির্ধারিত সময়ের কিছু পরে টেকঅফ করে বিমানটি। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই ককপিট থেকে ভেসে আসে এক চরম বিপদের সঙ্কেত – ‘মে-ডে কল’। ATC থেকে পাল্টা যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও, বিমানের কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যায়নি।
এরপরই ঘটে সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনা। বিমানবন্দর থেকে সামান্য দূরে, একটি মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলের উপর হঠাৎই ভেঙে পড়ে বিমানটি। আগুনের গোলা আর কালো ধোঁয়ায় ভরে যায় আকাশ। এই দুর্ঘটনায় বিমানের সকল যাত্রীরই প্রাণহানির আশঙ্কা করা হচ্ছে, যা আহমেদাবাদের বুকে এক নতুন শোকের ঢেউ এনে দিয়েছে।
৩৭ বছরের ব্যবধানে দুটি ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনা। একটি অবতরণের সময় দৃশ্যমানতার অভাবে, অন্যটি উড্ডয়নের পরপরই যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে। দুটি ঘটনাই আহমেদাবাদ বিমানবন্দরকে এক বেদনাবিধুর স্মৃতির সাক্ষী করে রাখল। তদন্ত চলছে, কিন্তু এই দুটি ট্র্যাজেডি এদেশের বিমান নিরাপত্তার ইতিহাসকে এক ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবতে বাধ্য করবে।