“১ মিনিটেই ধংস্ব হয়ে গেলো সবকিছু”-দুই অভিজ্ঞ পাইলট, তারপরেও কীভাবে দুর্ঘটনা?

আহমেদাবাদের আকাশে এক অভূতপূর্ব ট্র্যাজেডির জন্ম দিল এয়ার ইন্ডিয়ার লন্ডনগামী AI171 বিমান। যে উড়ান শুরু হয়েছিল নতুন দিগন্তের স্বপ্ন নিয়ে, তা মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে পরিণত হলো এক দুঃস্বপ্নে, এক জ্বলন্ত ধ্বংসস্তূপে। রানওয়ে থেকে উড্ডয়নের পরেই ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পেছনে কী রহস্য লুকিয়ে আছে, তা জানতে এখন গোটা দেশের নজর ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ সিভিল এভিয়েশন (DGCA) এবং তদন্তকারী দলের দিকে।
এক মিনিটের বিভীষিকা: যখন জীবন নামছিল ৬২৫ ফুট থেকে ৪৭৫ ফুট প্রতি মিনিটে
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, রানওয়ে ২৩ থেকে উড্ডয়নের পর বিমানটি খুব অল্প উচ্চতায় পৌঁছায়। কিন্তু এর পরেই শুরু হয় সেই এক মিনিটের বিভীষিকা। মাত্র ৬২৫ ফুট উচ্চতা থেকে বিমানটি হঠাৎ করে তীব্র গতিতে নিচে নামতে শুরু করে, প্রতি মিনিটে ৪৭৫ ফুট গতিতে! এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন পাইলটরা—ক্যাপ্টেন সুমিত সাবরওয়াল ও ফার্স্ট অফিসার ক্লাইভ কুন্দর। তাঁদের হাতে সময় ছিল মাত্র এক মিনিট। এই সংক্ষিপ্ত সময়েই তাঁদের জীবন-মৃত্যুর চরম সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল।
অভিজ্ঞ পাইলট, কিন্তু কেন সেই ‘MAYDAY’ কল?
বিমানটিতে ছিলেন অত্যন্ত অভিজ্ঞ দুই পাইলট। ক্যাপ্টেন সুমিত সাবরওয়ালের একারই উড়ান অভিজ্ঞতা ছিল ৮,২০০ ঘণ্টা, এবং সহ-পাইলট ক্লাইভ কুন্দরের অভিজ্ঞতা ছিল ১,১০০ ঘণ্টা। তাঁদের সম্মিলিত উড়ান অভিজ্ঞতা প্রায় ৯,৩০০ ঘণ্টা। এত অভিজ্ঞ পাইলটদের নেতৃত্বে থাকা সত্ত্বেও কেন এমন দুর্ঘটনা, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
এয়ার ট্র্যাফিক কন্ট্রোল (ATC)-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিমানটি উড্ডয়নের কিছুক্ষণের মধ্যেই একটি ‘MAYDAY’ কল পাঠায়। বিমান চলাচলে ‘MAYDAY’ একটি আন্তর্জাতিক সঙ্কেত, যা কেবলমাত্র চূড়ান্ত বিপদের সময় ব্যবহার করা হয়। এর অর্থ স্পষ্ট – পাইলটরা বুঝে গিয়েছিলেন, বিমানের মধ্যে কোনও ভয়াবহ প্রযুক্তিগত বা যান্ত্রিক সমস্যা দেখা দিয়েছে, যা সামাল দেওয়া কঠিন।
যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, তারপরই বিস্ফোরণ: জনবসতিতে নেমে এল অভিশাপ
কিন্তু সেই সংকেত পাঠানোর পর থেকেই ATC বিমানটির সঙ্গে আর কোনও যোগাযোগ স্থাপন করতে পারেনি। একাধিকবার চেষ্টা করেও বিমানের কোনও সাড়া মেলেনি। এরপরই ঘটে সেই ভয়ংকর ঘটনা। বিমানটি বিমানবন্দরের বাইরে একটি আবাসিক এলাকার ওপর ভেঙে পড়ে। প্রাথমিক অনুমান, একটি বহুতলের সঙ্গে ধাক্কা লেগেই ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। বহু দূর থেকে ঘন কালো ধোঁয়া দেখা যায়, যা এই দুর্ঘটনার ভয়াবহতা জানান দিচ্ছিল।
DGCA এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, “AI171 ফ্লাইটটি আহমেদাবাদ থেকে লন্ডনের গ্যাটউইক বিমানবন্দরের দিকে যাচ্ছিল। উড়ানের পরপরই এটি রানওয়ে ২৩ থেকে ছাড়ে এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই MAYDAY কল দেয়। এরপর আর কোনও যোগাযোগ হয়নি। বিমানটি রানওয়ের বাইরে গিয়ে একটি বসত এলাকায় ভেঙে পড়ে।”
উদ্ধারকাজ ও অনিশ্চিত হতাহতের সংখ্যা: প্রধানমন্ত্রীর নজরে তদন্ত
এই মুহূর্তে দুর্ঘটনাস্থলে জোর কদমে উদ্ধারকাজ চলছে। ধ্বংসাবশেষের মধ্য থেকে কিছু যাত্রীকে জীবিত অবস্থায় বের করা সম্ভব হয়েছে বলে প্রাথমিক সূত্রের দাবি। তবে এখনও পর্যন্ত সরকারি ভাবে মৃত্যুর সংখ্যা ঘোষণা করা হয়নি। যেহেতু দুর্ঘটনাটি একটি জনবসতিপূর্ণ এলাকায় ঘটেছে, তাই বিমানের যাত্রী ছাড়াও এলাকার বাসিন্দাদের হতাহতের সম্ভাবনাও রয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ঘটনার গুরুত্ব অনুধাবন করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিজে বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ নিয়েছেন। তিনি কেন্দ্রীয় অসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রী রামমোহন নাইডুর সঙ্গে ফোনে কথা বলেন এবং দুর্ঘটনার বিস্তারিত রিপোর্ট চেয়েছেন। একইসঙ্গে কেন্দ্র ও রাজ্য – উভয় স্তরেই উচ্চ পর্যায়ের তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ব্ল্যাক বক্সের অপেক্ষায় দেশ: কী বলবে ফ্লাইট ডেটা রেকর্ডার?
AI171 দুর্ঘটনার মূল কারণ জানতে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ব্ল্যাক বক্স উদ্ধার এবং ফ্লাইট ডেটা রেকর্ডারের বিশ্লেষণ। এই দুটি ডিভাইস থেকে প্রাপ্ত তথ্যই হয়তো এই ভয়াবহ এক মিনিটের রহস্য উন্মোচন করবে। গোটা দেশের নজর এখন DGCA ও তদন্তকারী দলের রিপোর্টের দিকে, যা এই মর্মান্তিক ঘটনার পেছনে লুকিয়ে থাকা সত্যকে সামনে আনবে। আশা করা যায়, এই তদন্ত ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা এড়াতে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেবে।