TMC-তে বড় পদ, কাশেম সিদ্দিকী কে? ২০২৬ এর নির্বাচনের আগে মমতার ‘সেরা’ চাল?

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ক বরাবরই একটি নির্ণায়ক শক্তি। আর এই ভোটব্যাঙ্কের উপর ফুরফুরা শরিফের প্রভাব নতুন করে বলার কিছু নেই। বহু বছর ধরে ফুরফুরা শরিফের পীরজাদারা সক্রিয়ভাবে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। কখনও সরাসরি, কখনও পরোক্ষে তাদের প্রভাবকে কাজে লাগিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। তবে এবার এই সমীকরণে এক নতুন নাম আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে – কাশেম সিদ্দিকী।

কে এই কাশেম সিদ্দিকী?
কাশেম সিদ্দিকী ফুরফুরা শরিফেরই একজন পীরজাদা। এর আগে তাঁকে সেভাবে রাজনৈতিক আঙিনায় দেখা যায়নি। কিন্তু ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন এবং তারপর থেকে রাজ্য সরকারের সমালোচনায় তিনি একাধিকবার মুখ খুলেছেন। একসময় সিপিএম-এর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা নিয়েও নানা মহলে জল্পনা ছিল। তাঁর তুতো ভাই আব্বাস সিদ্দিকী যখন ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট (ISF) গঠন করেন, তখন কাশেম তাঁকে সরাসরি সমর্থন জানান। এমনকি নওশাদ সিদ্দিকী গ্রেফতার হওয়ার পর কাশেম সিদ্দিকী তাঁর প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছিলেন। এমন প্রেক্ষাপটে হঠাৎ করে কাশেমকে তৃণমূলের ঘনিষ্ঠ হতে দেখে রাজনৈতিক মহলে অনেকেই বিস্মিত।

কাশেম সিদ্দিকীকে কেন তৃণমূলে?
সম্প্রতি তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে কাশেম সিদ্দিকীকে রাজ্য সাধারণ সম্পাদক পদে নিয়োগ করা হয়েছে। তৃণমূলের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে। দলের নেতাদের মতে, রাজ্যের সংখ্যালঘু সমাজে একটি নতুন এবং প্রভাবশালী মুখ তুলে আনতেই কাশেমকে এই পদে আনা হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে তৃণমূলের একটি স্পষ্ট কৌশল কাজ করছে – ফুরফুরা শরিফের অপর প্রভাবশালী পীরজাদা ত্বহা সিদ্দিকীর ভূমিকা ও গ্রহণযোগ্যতা বর্তমানে কিছুটা দুর্বল বলে মনে করা হচ্ছে। সেই শূন্যস্থান পূরণ করতেই কাশেমকে সামনে আনার পরিকল্পনা করেছে তৃণমূল।

ফুরফুরা শরিফে ‘ঠাকুরনগর মডেল’এর ছায়া?
বিজেপি যেভাবে ঠাকুরনগরে মতুয়া ভোট ধরে রাখতে ঠাকুরবাড়ির দুই শিবিরকে (শান্তনু ঠাকুর এবং মমতাবালা ঠাকুর) ব্যবহার করছে, ঠিক একই ছক কি এবার তৃণমূল ফুরফুরা শরিফে প্রয়োগ করতে চাইছে? একদিকে ত্বহা সিদ্দিকী, অন্যদিকে কাশেম সিদ্দিকী – এই দুই শিবিরের দ্বৈরথে রাজনৈতিক সুবিধা তুলতে চাইছে ঘাসফুল শিবির?

ত্বহা সিদ্দিকী ইতিমধ্যেই এই পদক্ষেপের তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি মন্তব্য করেছেন, “যে নবান্নকে সবাই চোর বলেছিল, সেই লোকই এখন মমতার পাশে।” তিনি আরও অভিযোগ করেন, ফুরফুরাকে মতুয়াদের মতো ব্যবহার করতে চাইছে কেউ কেউ, কিন্তু তা সফল হবে না।

এর পাল্টা জবাবে কাশেম সিদ্দিকী বলেন, “ফুরফুরায় কোনও সমস্যা নেই, সমস্যা হচ্ছে একজনই। যিনি সবসময় চিৎকার করেন। তিনি কালো চশমা পরে থাকেন, তাই হয়তো সবকিছু স্পষ্ট দেখতে পান না।”

নির্বাচনের আগে নতুন অঙ্ক
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন যতই এগিয়ে আসছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ক ঘিরে নতুন করে জোর দিচ্ছে তৃণমূল। মুসলিম ভোটের বিভাজন যাতে না হয়, তা নিশ্চিত করতে চাইছে দল। ২০২১ সালে আব্বাস ও নওশাদের আইএসএফ যেভাবে সংখ্যালঘু ভোট কেটে নিয়েছিল, তা থেকে শিক্ষা নিয়েই এবার আগেভাগে প্রস্তুতি নিচ্ছে তৃণমূল।

এই প্রেক্ষাপটে কাশেম সিদ্দিকীর উত্থান যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক ফুরফুরা সফরে তাঁকে কাশেমের পাশে দেখা গেছে, যেখানে ত্বহা কিংবা আব্বাস-নওশাদ উপস্থিত ছিলেন না। পার্ক সার্কাসের ইফতারেও একই ছবি দেখা গেছে।

ত্বহার প্রভাব কি কমছে?
ত্বহা সিদ্দিকী বরাবরই তৃণমূলপন্থী ছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি তাঁর অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তৃণমূলের অন্দরেও মনে করা হচ্ছে, তাঁর সঙ্গে কাজ করা সহজ নয়। কাশেম সিদ্দিকী সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে পারেন কি না, তা ভবিষ্যতই বলবে। তবে আপাতত তৃণমূল পরিষ্কার বার্তা দিচ্ছে – ফুরফুরা শরিফে নতুন মুখ, নতুন ভরসা কাশেম সিদ্দিকী।

এই সিদ্ধান্তই সম্ভবত ফুরফুরার রাজনীতিতে এক নতুন মোড় আনতে চলেছে। পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যালঘু রাজনীতিতে এই নতুন সমীকরণ কী প্রভাব ফেলে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।