নাবালিকার বিয়েতে ভোজ খেতে গেলে জেল হতে পারে অতিথিদেরও, কঠোর পথে প্রশাসন

বাল্যবিবাহ রোধে পশ্চিমবঙ্গ সরকার একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও সমাজের বিভিন্ন স্তরে এই প্রবণতা এখনো পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। এই চেনা ছবি ভাঙতেই এবার আরও কঠোর অবস্থান নিতে চলেছে রাজ্য প্রশাসন। ২০০৬ সালের ‘প্রোহিবিশন অফ চাইল্ড ম্যারেজ অ্যাক্ট’-এর নিরিখে রাজ্য সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, নাবালক-নাবালিকার বিয়েতে শুধু পাত্র-পাত্রী বা তাঁদের পরিবারই নয়, বিয়েতে আমন্ত্রিত অতিথিরাও দায়ে পড়তে পারেন।

রাজ্য সরকারের নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, যারা শুধু বিয়েবাড়িতে ভোজ খেতে যান, তারাও আইনের আওতায় পড়তে পারেন। শুধু তাই নয়, আমন্ত্রিত ব্যক্তিদের পাশাপাশি পুরোহিত, ক্যাটারার, বা অনুষ্ঠান-সংশ্লিষ্ট কোনো পরিষেবা প্রদানকারী সকলেই শাস্তির মুখোমুখি হতে পারেন। এমনকী জেল-জরিমানাও হতে পারে। এই আইন আগেও ছিল, তবে বাল্যবিবাহ রুখতে এবার সেই আইনের কথাই জোর দিয়ে মনে করিয়ে দিচ্ছে রাজ্য প্রশাসন।

ইতিমধ্যেই জেলার প্রশাসনিক কর্তাদের কাছে এই সংক্রান্ত গাইডলাইন পৌঁছে গিয়েছে। নারী, শিশু ও সমাজকল্যাণ দফতর থেকে গত ১৫ মে একটি বিস্তারিত নির্দেশিকা জেলার আধিকারিকদের কাছে পাঠানো হয়েছে। সেখানে এই আইন প্রয়োগের বিষয়টি আরও জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, জেলাগুলিও সেই অনুযায়ী কাজ শুরু করে দিয়েছে।

প্রসঙ্গত, পঞ্চম জাতীয় পারিবারিক স্বাস্থ্য সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, এখনও পশ্চিমবঙ্গের একাধিক জেলা যেমন পূর্ব মেদিনীপুর, পূর্ব বর্ধমান, মুর্শিদাবাদ, হুগলি, বাঁকুড়া, দক্ষিণ দিনাজপুর, কোচবিহার জেলায় বাল্যবিবাহের খবর পাওয়া যায়। প্রশাসনের আধিকারিকদের মতে, এখনো বহু পরিবার মনে করেন, মেয়ের দ্রুত বিয়ে দিলে দায়মুক্ত হওয়া যায়। আর সেই মানসিকতা দেখা যায় নাবালিকার আত্মীয়-পরিজন বা প্রতিবেশীদের মধ্যেও। তাঁরাও রীতিমতো বিয়েতে অংশগ্রহণ করেন, অথচ কোনো প্রতিবাদ জানান না।

এমন পরিস্থিতিতেই রাজ্য শিশু সুরক্ষা কমিশন মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, নাবালিকার বিয়েতে আমন্ত্রিতরাও দায় এড়াতে পারেন না। কমিশনের তরফে জানানো হচ্ছে, শিশু সুরক্ষার বিষয়ে আয়োজিত প্রতিটি কর্মশালাতেই এই বার্তা দেওয়া হচ্ছে এবং আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা নিয়ে সচেতনতা গড়ে তোলা হচ্ছে। ইতিমধ্যে নদিয়া, বীরভূম, দার্জিলিং-সহ বিভিন্ন জেলায় এই সংক্রান্ত হোর্ডিং, পোস্টার লাগানো হয়েছে। সমাজমাধ্যমকেও ব্যবহার করা হচ্ছে। বাড়ি গিয়েও বোঝানো হচ্ছে যে, নাবালিকার বিয়ে মানেই শুধু সামাজিক অন্যায় নয়, তা একটি ফৌজদারি অপরাধও বটে। রাজ্য প্রশাসনের এক আধিকারিক জানান, বুঝিয়ে কাজ না হলে কড়া পদক্ষেপ করা প্রয়োজন।

এই নতুন নির্দেশিকা এবং কঠোর পদক্ষেপ বাল্যবিবাহ রোধে কতটা কার্যকর হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। সমাজের সর্বস্তরে সচেতনতা এবং আইনি প্রয়োগের মাধ্যমে এই সামাজিক ব্যাধিকে নির্মূল করাই এখন প্রশাসনের লক্ষ্য।