“আমি শিশুদের মতো ঘুমাব”-১৭ বছরের আক্ষেপ ঘুচিয়ে যা বললেন বিরাট কোহলি

বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র, প্রায় সব বৈশ্বিক সাফল্যের মুকুট যাঁর মাথায়, সেই বিরাট কোহলির আক্ষেপ ছিল শুধু একটি – ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রতিযোগিতা আইপিএলের (IPL) ট্রফি। ১৮ বছরের সেই অপূর্ণতা অবশেষে ঘুচলো। ২০০৮ সাল থেকে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর (RCB) জন্মলগ্ন থেকেই খেলে আসছেন কোহলি, তিনবার হৃদয় ভেঙেছিল, এবার চতুর্থবার ফাইনাল খেলতে নেমে চ্যাম্পিয়ন হলেন তিনি।
পাঞ্জাব কিংসের (PBKS) বিপক্ষে গতকাল (মঙ্গলবার) ফাইনালে নামার আগেই আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামের গ্যালারি যেন বেঙ্গালুরুর লাল রঙে রাঙা হয়ে উঠেছিল। মনে হচ্ছিল, সবাই ছুটে এসেছিলেন একটি দল এবং তাদের বড় তারকা কোহলির বহু প্রতীক্ষিত জয় দেখতে। ম্যাচের অনেকটা সময় বাকি থাকতেই জয়ের পাল্লাটা বেঙ্গালুরুর দিকে হেলে পড়েছিল, বাকি ছিল কেবল শেষ ঘণ্টার অপেক্ষা। কী ঘটতে চলেছে, তা আঁচ করতে পেরে চার বল বাকি থাকতেই বিরাট কোহলি কান্না শুরু করেন। আর শেষ বল হওয়ার পরই হাঁটু মুড়ে মাটিতে বসে পড়লেন তিনি, দু’হাতে ঢেকে ফেললেন চোখ।
৬ রানের জয় নিশ্চিত হওয়ার পর পরম প্রাপ্তির আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েছিলেন কোহলি। পাশ থেকে দুই সতীর্থের পিঠ চাপড়ানি, গোটা মাঠের গর্জন, সতীর্থদের পাগলপারা উচ্ছ্বাস— কিছুই যেন তাঁকে ছুঁতে পারছিল না। ঘোর কাটিয়ে কিছুক্ষণ পরই জানালেন, “একজন স্পোর্টসম্যান হিসেবে আমরা এমন মুহূর্তের জন্য প্রবল অপেক্ষায় থাকি, এটি বর্তমান বিশ্ব ক্রিকেটে উচ্চ মানসম্পন্ন টুর্নামেন্টগুলোর একটি। আমি সবসময়ই বড় টুর্নামেন্ট ও বড় মুহূর্তের অংশ হতে চেয়েছি। কিন্তু এটি (আইপিএল শিরোপা) অপূর্ণ ছিল এবং আজ রাতে আমি শিশুদের মতো ঘুমাব।”
“এই ট্রফি সমর্থকদেরও” – ১৮ বছরের অপেক্ষার গল্প
তবে এই অপেক্ষা কেবল কোহলিরই ছিল না। দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে তিনটি ফাইনালে ভগ্ন হৃদয়ে ঘরে ফেরা বেঙ্গালুরু সমর্থকদেরও তাই স্মরণ করলেন তিনি। আবেগাপ্লুত কোহলি বলেন, “এই ট্রফি দলের জন্য যতটা, ততটাই সমর্থকদের জন্য। ১৮ বছর পেরিয়ে গেছে এই দিনটা দেখতে। এই দলটাকে নিজের যৌবন, নিজের সেরা সময় এবং অভিজ্ঞতা দিয়েছি। প্রত্যেক মৌসুমে ট্রফি জেতার আপ্রাণ চেষ্টা করেছি, নিজের সবটা দিয়েছি। তাতেও ট্রফি পাইনি। অবশেষে এই দিনটা দেখতে পাওয়া অবিশ্বাস্য এক অনুভূতি।”
জয় পাওয়ার মুহূর্তটা নিয়ে কোহলি বললেন, “কখনোই ভাবিনি এই দিনটা দেখতে পারব। তাই শেষ বলটা হওয়ার পর নিজের আবেগ আর সামলাতে পারিনি। নিজের শক্তির প্রত্যেকটা আউন্স এই দলটাকে দিয়েছি।”
সতীর্থ ও সহধর্মিনীকে কৃতিত্ব
লম্বা সময় তাঁর সঙ্গে একসঙ্গে বেঙ্গালুরুর জার্সিতে খেলেছেন দক্ষিণ আফ্রিকান কিংবদন্তি এবি ডি ভিলিয়ার্স (ABD)। কোহলি তাঁকেও কৃতিত্ব দিয়েছেন চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর। বলেন, “এবিডি এই দলের জন্য যা করেছে তা কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। ম্যাচের পর ওকে বলেছিলাম, ‘এই জয় যতটা আমাদের, ততটাই তোমার। আমি চাই তুমিও আমাদের সঙ্গে উৎসব করো।'”
কয়েক বছর বেঙ্গালুরুতে খেলেছেন আরেক ক্যারিবীয় কিংবদন্তি ক্রিস গেইলও (Chris Gayle)। ভিলিয়ার্স এবং গেইল – দুজনকেই ফাইনাল জয়ের মঞ্চে পেয়েছেন কোহলি। চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর কোহলি সতীর্থদের সঙ্গে সুখস্মৃতি তুলে ধরলেন এভাবে: “আমরা তিনজন একসঙ্গে কত বছর এই দলটার সঙ্গে কাটিয়েছি। তিনজনই নিজেদের সেরা সময়টা বেঙ্গালুরুকে দিয়েছি। সেই স্মৃতি কখনও ভোলা যাবে না। তাই আজ ট্রফি জেতার সময়ে সবার আগে ওদের কথাই মাথায় আসছে। আমি ভাগ্যবান যে আজ ওদের পাশে পেয়েছি। চাই এর পর ওরা দলের সঙ্গে বেঙ্গালুরু গিয়ে ট্রফিজয়ের উৎসব করুক।”
সবশেষে এলো সহধর্মিনী আনুশকা শর্মার (Anushka Sharma) প্রসঙ্গ। যিনি মাঠে থেকে সুসময়-দুঃসময়ে পাশে ছিলেন ভারতীয় তারকার। গতকালও তাঁর চোখেমুখে ছিল অবিশ্বাসী চাহনি। শিরোপা জিতে আনুশকাকে কৃতিত্ব দিয়ে কোহলি বলেন, “২০১৪ সাল থেকে বেঙ্গালুরুকে সমর্থন করছে। সে নিজেও বেঙ্গালুরুর মেয়ে। আমাকে সবচেয়ে বেশি কাছ থেকে দেখেছে সে। কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যখন গিয়েছি, যখন ভেঙে পড়েছি, আর কিছুই ভালো লাগেনি, তখন আনুশকাই আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। আমাকে ভরসা দিয়েছে। নতুন করে উঠে দাঁড়ানোর সাহস জুগিয়েছে। সহধর্মিনী পাশে না থাকলে এর কিছুই সম্ভব হত না।”
কোহলির এই জয় কেবল একটি আইপিএল শিরোপা নয়, এটি ধৈর্য, অধ্যবসায় এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।