দুর্লভ অস্ত্রোপচারে নতুন জীবন পেল মালদার শিশু, বাংলায় বিরল হৃদরোগের সফল চিকিৎসা

মালদার এক ছয় বছরের শিশুর জটিল হৃদযন্ত্রের সমস্যা আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসায় সফলভাবে সারিয়ে তোলা হয়েছে কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে। বেঙ্গালুরুতেও সমাধান না মেলায়, অবশেষে আলিপুরের বিএম বিড়লা হার্ট হাসপাতাল সেই বিরল হৃদরোগে আক্রান্ত শিশুটিকে নতুন জীবন দিয়েছে। এই সাফল্য পূর্ব ভারতে প্রথম, যা শিশুদের হৃদরোগের চিকিৎসায় পশ্চিমবঙ্গের সক্ষমতাকে প্রমাণ করে।

এক বিরল হৃদরোগের আখ্যান
জানা গেছে, শিশুটি দীর্ঘদিন ধরে জ্বর, সর্দি-কাশিতে ভুগছিল। বাড়ির সামনের একজন সাধারণ চিকিৎসকই প্রথম শিশুর হৃদযন্ত্রে একাধিক সমস্যার উপস্থিতি ধরতে পারেন। এরপর বাবা-মা তাকে নিয়ে বেঙ্গালুরু যান, কিন্তু সেখানে কোনও সুরাহা না হওয়ায় এবং দিল্লি রেফার করার পর, তারা নিজেদের রাজ্যেই ফিরে আসেন। অবশেষে কলকাতার বিএম বিড়লা হার্ট হাসপাতালের চিকিৎসক কুন্তল রায়চৌধুরীর শরণাপন্ন হন।

একাধিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ধরা পড়ে, শিশুটি একটি অত্যন্ত জটিল ও বিরল রোগে ভুগছে, যার নাম Congenitally Corrected Transposition of Great Arteries (CCTGA)। চিকিৎসক কুন্তল রায়চৌধুরীর মতে, এই ঘটনা সারা পৃথিবীতে খুব কম শিশুর ক্ষেত্রে দেখা যায়।

হৃদযন্ত্রের উল্টো গঠন ও জটিলতা
ডাঃ রায়চৌধুরী ব্যাখ্যা করেন, “আমাদের হৃদয়ের যা গঠন থাকে, ওর ক্ষেত্রে তা ঠিক বিপরীত এবং খুব জটিল। সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে ডানদিকের অলিন্দ যুক্ত থাকে ডানদিকের নিলয়ের সঙ্গে এবং সেটা যুক্ত থাকে ফুসফুসের সঙ্গে। ফুসফুস থেকে অক্সিজেন নিয়ে রক্ত বামদিকে যায়। কিন্তু এই শিশুটির ক্ষেত্রে তা ছিল বিপরীত। অর্থাৎ ওর ডানদিকের অলিন্দের সঙ্গে বাঁদিকের নিলয় যুক্ত ছিল। এর ফলে ডানদিকের অলিন্দ থেকে দূষিত রক্ত যাচ্ছে বাঁদিকের অলিন্দে, আর সেটা আবার যুক্ত রয়েছে ফুসফুসের সঙ্গে।” যদিও এক্ষেত্রে অক্সিজেনের সমস্যা হচ্ছিল না, হৃদযন্ত্রে অক্সিজেন সরবরাহ স্বাভাবিক ছিল।

তবে মূল সমস্যা ছিল অন্য জায়গায়। ডাঃ রায়চৌধুরী আরও বলেন, “আমাদের সকলের শরীরে বাঁদিকের যে নিলয়, সেটা সবথেকে বেশি শক্তিশালী এবং পেশীবহুল হয়। সেখানেই যুক্ত থাকে মহাধমনী। কিন্তু এই শিশুটার ক্ষেত্রে মহাধমনী ছিল ডান দিকের নিলয়ের সঙ্গে যুক্ত। এর ফলে ওর পাম্পিং চেম্বারে সমস্যা হচ্ছিল। তার পাশাপাশি ওর ডানদিকে যে ভালভ রয়েছে (ট্রাইকাস্পিড ভালভ) সেখানে ছিদ্র হতে দেখা যায়, যেটা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকবে এবং ডানদিকের নিলয় অকেজো হয়ে যাবে। তখন হয়তো আর কিছু করার উপায় থাকত না।” এছাড়াও, শিশুর হার্টের ফুটো (Ventricular Septal Defect) এবং ফুসফুসের রাস্তা ছোট ছিল (পালমোনারি স্টেনোসিস)।

‘ডাবল সুইচ সার্জারি’ ও নতুন দিগন্ত
এই বিরল রোগের চিকিৎসায় চিকিৎসকরা যে অস্ত্রোপচার পদ্ধতি ব্যবহার করেন, তা হলো ‘ডাবল সুইচ সার্জারি’, অর্থাৎ সেনিং ও রাসটেলি। এর সঙ্গে ডিকেএস (Damus-Kaye-Stansel) পদ্ধতিও যুক্ত করা হয়। ডাঃ কুন্তল রায়চৌধুরী জানান, “পূর্বভারতে প্রথম এই সার্জারি করা হল। ওই হার্টের ফুটোকে কাজে লাগিয়ে আমরা ওর অস্ত্রোপচার করেছি। বাঁদিকের নিলয়ের সঙ্গে মহাধমনীকে যুক্ত করেছি, যেটা ওই ছিদ্রটাকে দিয়েই করা হয়েছে। কিন্তু আমরা সেখানে আরও একটা রাস্তা করেছি। অর্থাৎ মহাধমনীতে বাঁদিকের নিলয় যুক্ত হওয়ার জন্য ওর দু’টো রাস্তা রয়েছে। ও যখন বড় হবে, তখন আর ওই ছিদ্রটা বাড়বে না। সেই সময় যাতে রক্ত চলাচলে বাধা না হয়, তাই আরেকটা অতিরিক্ত পথ তৈরি করা হয়েছে মহাধমনীতে রক্ত যাওয়ার জন্য। এর সঙ্গেই সেনিং অপারেশন করে আমরা ডানদিকের অলিন্দের দূষিত রক্ত ডানদিকের নিলয়ের সঙ্গে যুক্ত করেছি।”

প্রায় আট ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলে এই জটিল অস্ত্রোপচার। ডাঃ কুন্তল রায়চৌধুরীর নেতৃত্বে এই দলে ছিলেন পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজিস্ট ডাঃ শ্যামাজিৎ সমাদ্দার, পেডিয়াট্রিক কার্ডিয়াক ইনটেনসিভিস্ট ডাঃ শতরূপা মুখোপাধ্যায়, এবং কার্ডিয়াক অ্যানাস্থেটিস্ট ডাঃ প্রবীরকুমার দাস। অপারেশনের সময় শিশুটির হৃদযন্ত্রকে প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা বন্ধ রাখা হয়েছিল এবং এই সময় ফুসফুস ও হৃদযন্ত্রের একটি মেশিনের সাহায্যে তাকে সচল রাখা হয়। পারফিউশন এবং নার্সিং টিমের ভূমিকাও এই সফলতায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

বিনামূল্যে জীবনদান ও ভবিষ্যতের আশা
শিশুটির বাবা, যিনি পেশায় একটি বেসরকারি পেট্রল পাম্পে কাজ করেন, জানান যে শিশুসাথী কার্ডের সাহায্যে তারা এই চিকিৎসা বিনামূল্যে করাতে পেরেছেন। ৫ মে অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয় এবং ২৭ মে শিশুটিকে হাসপাতাল থেকে ছুটি দেওয়া হয়। তিনি বলেন, “আমার ছেলে সম্পূর্ণ সুস্থ এখন। কোনো সমস্যা নেই।”

ডাঃ কুন্তল রায়চৌধুরী বলেন, “এইরকম অপারেশন আশা জাগায় ও প্রমাণ করে যে বাচ্চাদের হৃদরোগের চিকিৎসার জন্য পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বাইরে যাওয়ার দরকার নেই।” এই সাফল্য কেবল একটি শিশুর জীবনই বাঁচায়নি, বরং রাজ্যের চিকিৎসা পরিকাঠামোর সক্ষমতা এবং জটিল রোগের চিকিৎসায় পশ্চিমবঙ্গের অগ্রগতির প্রমাণও তুলে ধরেছে।