ভূগোলের পাঠ পড়ালেন হিমন্ত বিশ্বশর্মা, ব্রহ্মপুত্রের জল নিয়ে পাকিস্তানের ‘ফাঁকা হুমকি’র জবাব

সিন্ধু জলচুক্তি স্থগিত রাখার ভারতের সিদ্ধান্তের পর পাকিস্তানের পক্ষ থেকে যখন একের পর এক হুমকি শোনা যাচ্ছিল, এবার তাতে যোগ হলো চীনের প্রসঙ্গ। ইসলামাবাদের নয়া হুঁশিয়ারি ছিল, চীন যদি ব্রহ্মপুত্রের জল আটকে দেয়, অর্থাৎ ঘুরপথে ভারতকে ভয় দেখানোর চেষ্টা। কিন্তু আজ তার উপযুক্ত জবাব দিয়েছেন অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা। পাক প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তির হুঁশিয়ারি উড়িয়ে দিয়ে তিনি পাকিস্তানের ভূগোলের পাঠ পড়িয়েছেন। তার দাবি, চীন ব্রহ্মপুত্রে বাঁধ দিলে ভারতে অসুবিধা নয়, বরং সুবিধাই হবে।

পাকিস্তানের কল্পনার কাহিনী বুনন

হিমন্ত বিশ্বশর্মা দাবি করেছেন, কল্পনার বশবর্তী হয়ে পাকিস্তান কাহিনী বুনতে শুরু করেছে। ভারত যেমন পাকিস্তানের সঙ্গে সিন্ধু জলচুক্তি স্থগিতের ঘোষণা করেছে, একই ভাবে যদি চীন ব্রহ্মপুত্রের জল আটকে দেয় তাহলে কী করবে দিল্লি— সম্প্রতি এই মর্মে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফের ঘনিষ্ঠ নাইহুসান আফজাল। আর তা নিয়েই সোশ্যাল মিডিয়ায় আফজালকে কড়া জবাব দিয়েছেন হিমন্ত। আফজালের দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন তিনি।

তথ্যের আলোকে হিমন্তের ব্যাখ্যা

সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে হিমন্ত লিখেছেন, ভারতের সিন্ধু জলচুক্তি স্থগিত করার কাহিনী তৈরি করেছে পাকিস্তান। চীন ভারতের ব্রহ্মপুত্রের জল দেওয়া বন্ধ করলে কী হবে— তথ্য সহ তা ব্যাখ্যা করছি। তার কথায়, স্বচ্ছতার মাধ্যমে ভুল ধারণা ভাঙতে হবে। তিনি জানান, ব্রহ্মপুত্রের বৃদ্ধি হয়েছে ভারতে, সংকোচন নয়। ব্রহ্মপুত্রের মোট জলস্রোতের ৩০-৩৫ শতাংশ চীনের নিয়ন্ত্রণে, যা মূলত হিমবাহের গলন ও তিব্বতের সামান্য বৃষ্টি থেকে আসে। কিন্তু জলস্রোতের বাকি ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ ভারতেই অরুণাচল, অসম, নাগাল্যান্ড, মেঘালয়ের মৌসুমী বৃষ্টিতে তৈরি হয়। সুবানসিরি, লোহিত, কামেং, মানস, ধানসিড়ি, জিয়া ভরলি, কপিলি, কৃষ্ণাই, দিগারু, কুলসির মতো উপনদীর দৌলতে ব্রহ্মপুত্র জলে ভরে থাকে।

হিমন্ত আরও ব্যাখ্যা করেন, ভারত-চীন সীমান্তে ব্রহ্মপুত্রের জলস্রোত ২ হাজার থেকে ৩ হাজার কিউবিক মিটার প্রতি সেকেন্ডে। আর অসমের সমতল গুয়াহাটিতে তা ফুলে ফেঁপে ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার। ব্রহ্মপুত্রের উজানের উপর ভারত নির্ভরশীল নয়। ব্রহ্মপুত্র ভারতের বৃষ্টি নির্ভর নদী ব্যবস্থার মধ্যে পড়ে। এটি ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রবেশের পরই শক্তিশালী হয়েছে। এই সত্যটা পাকিস্তানের জানা দরকার।

চীনের পদক্ষেপ ভারতের জন্য আশীর্বাদ?

আশ্চর্যজনকভাবে হিমন্ত বলেন, যদি চীন জলের স্রোত বন্ধ করার কথা ভাবে (যদিও চীন এমন কোনো কথা বলেনি), তাতে ভারত উপকৃতই হবে। কারণ প্রতি বছর অসমে বন্যা হয় না, যাতে লক্ষ লক্ষ মানুষ ঘর ছাড়া হন এবং জীবন জীবিকা নষ্ট হয় প্রতি বছর। এই বক্তব্য পাকিস্তানের ‘জল-যুদ্ধ’ বা ‘হুমকি’র আখ্যানকে পুরোপুরি নস্যাৎ করে দেয়।

সিন্ধু চুক্তির সুবিধা এবং পাকিস্তানের আতঙ্ক

অন্যদিকে, হিমন্ত স্মরণ করিয়ে দেন যে পাকিস্তান ৭৪ বছর ধরে সিন্ধু জলচুক্তির সুবিধা নিয়ে এসেছে। এখন ভারত নিজের সার্বভৌম ক্ষমতা দাবি করায় তারা আতঙ্কিত। তাদের মনে করিয়ে দেওয়া উচিত, ব্রহ্মপুত্রকে কোনো এক পক্ষ নিয়ন্ত্রণ করে না। আমাদের ভূগোল, বর্ষা এবং সভ্যতা তাকে নিয়ন্ত্রণ করে।

অসমের মুখ্যমন্ত্রীর এই তথ্যভিত্তিক এবং স্পষ্ট জবাব আন্তর্জাতিক মহলে ভারতের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে। এটি কেবল পাকিস্তানের ফাঁকা হুমকিকে প্রত্যাখ্যান করেনি, বরং আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নদীর জলসম্পদ নিয়ন্ত্রণের জটিলতা এবং ভারতের আত্মনির্ভরশীলতার চিত্রও তুলে ধরেছে।

Sources