আলোচনার পথে সন্ত্রাসবাদের কাঁটা, পাকিস্তানের প্রতি থারুরের কড়া বার্তা

পাকিস্তানের সঙ্গে অর্থপূর্ণ আলোচনার জন্য সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপই মূল শর্ত— এই বার্তা দিলেন কংগ্রেস সাংসদ শশী থারুর। ব্রাজিলে একটি সর্বদলীয় সংসদীয় প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, পাকিস্তানের ভূখণ্ডে সন্ত্রাসবাদী পরিকাঠামো বহাল থাকলে শান্তি প্রতিষ্ঠা কঠিন।
থারুর জোর দিয়ে বলেন, ভারত আলোচনার জন্য প্রস্তুত, তবে তা তখনই সম্ভব যখন পাকিস্তান তাদের দেশে দৃশ্যমান সন্ত্রাসবাদের পরিকাঠামোর বিরুদ্ধে ‘উল্লেখযোগ্য’ পদক্ষেপ নেবে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “যদি পাকিস্তান তাদের দাবির মতো নির্দোষ হয়, তবে তারা কেন অবাঞ্চিত জঙ্গিদের নিরাপদ আশ্রয় দেয়? কেন তারা শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে পারে, প্রশিক্ষণ শিবির পরিচালনা করে, মানুষকে আরও উগ্রপন্থী করে তোলে, অস্ত্র সরবরাহ করে এবং কালাশনিকভের মতো অস্ত্র ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেয়?” এই প্রশ্নগুলো পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদী পরিকাঠামোর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরে।
সন্ত্রাসবিরোধী বার্তা লাতিন আমেরিকায়
ব্রাজিল সফরে থারুরের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দল লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর কাছে ভারতের সন্ত্রাসবিরোধী বার্তা সফলভাবে পৌঁছে দিয়েছে। তিনি জানান, “আমরা সফলভাবে ভারতের বার্তা পৌঁছে দিয়েছি। এমনকি যেসব দেশের মধ্যে কিছু ভুল বোঝাবুঝি থাকতে পারে, তাদের কাছেও আমরা আমাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছি।” এর মাধ্যমে ভারত বিশ্ব মঞ্চে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে তার দৃঢ় অবস্থান বজায় রেখেছে এবং এই ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের জন্য কাজ করে যাচ্ছে।
পহেলগাঁও হামলা ও ‘অপারেশন সিঁদুর’
ভারতের সন্ত্রাসবিরোধী অবস্থানের প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে ঘটে যাওয়া এক জঙ্গি হামলার প্রসঙ্গ উঠে আসে। গত ২২ এপ্রিলের সেই হামলায় ২৬ জন নিরীহ মানুষ নিহত হন। এর জবাবে ভারত গত ৭ মে ‘অপারেশন সিঁদুর’ শুরু করে, যার অধীনে পাকিস্তান ও পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরে (পিওকে) নয়টি জঙ্গি ঘাঁটিতে নির্ভুল হামলা চালানো হয়। এই অপারেশনে জয়শ-ই-মোহাম্মদের নেতা আবদুল রউফ আজহার সহ ১০০-এর বেশি জঙ্গি নিহত হয়।
জবাবে পাকিস্তান ১০ মে ভোরে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ভারতীয় সীমান্ত শহরগুলিতে হামলা চালায়। ভারতীয় বিমান বাহিনী পাল্টা হামলায় ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডির নূর খান এবং চকলালা বিমানঘাঁটি ধ্বংস করে। চার দিনের সংঘাতের পর ১০ মে সন্ধ্যা ৫টা থেকে উভয় দেশ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়।
আলোচনার চ্যালেঞ্জ এবং পাকিস্তানের অবিশ্বাস্যতা
শশী থারুর উল্লেখ করেন, পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনার প্রধান বাধা হলো তাদের সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের প্রতি সমর্থন। তিনি জানান, পাকিস্তানের মাটিতে জঙ্গি সংগঠনগুলো প্রকাশ্যে কার্যক্রম পরিচালনা করে, যা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পথে বড় বাধা। “যতক্ষণ না পাকিস্তান তাদের দেশে সন্ত্রাসবাদী পরিকাঠামো ধ্বংস করার জন্য কঠোর পদক্ষেপ নেয়, ততক্ষণ ভারতের পক্ষে তাদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ আলোচনা করা কঠিন,” থারুর বলেন। তিনি আরও যোগ করেন, পাকিস্তানের দাবি যে তারা সন্ত্রাসবাদের শিকার, তা বিশ্বাসযোগ্য নয়, কারণ তারা জঙ্গিদের নিরাপদ আশ্রয় প্রদান করে এবং তাদের প্রশিক্ষণ শিবির পরিচালনার অনুমতি দেয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ১০ মে সন্ধ্যায় পাকিস্তানের ডিজিএমও-এর উদ্যোগে ভারতের ডিজিএমও লেফটেন্যান্ট জেনারেল রাজীব ঘাইয়ের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। তবে, জেনারেল ঘাই জানান, এই যুদ্ধবিরতি কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাকিস্তান সীমান্তে গোলাবর্ষণ এবং ড্রোন অনুপ্রবেশের মাধ্যমে লঙ্ঘন করে। এই ঘটনা পাকিস্তানের অবিশ্বস্ততার প্রমাণ হিসেবে দেখা হয়েছে। থারুর বলেন, এই ধরনের আচরণ পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনাকে আরও জটিল করে তুলেছে।
আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের দৃঢ়তা
ব্রাজিল সফরে শশী থারুর লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনায় ভারতের সন্ত্রাসবিরোধী অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছেন। তিনি বলেন, ভারত বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে সন্ত্রাসবাদ একটি বিশ্বব্যাপী সমস্যা এবং এর বিরুদ্ধে সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। থারুর জোর দিয়ে বলেন, পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। “যতক্ষণ না পাকিস্তান তাদের মাটিতে জঙ্গি প্রশিক্ষণ শিবির এবং পরিকাঠামো ধ্বংস করে, ততক্ষণ তাদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ আলোচনা সম্ভব নয়,” তিনি বলেন।
শশী থারুরের এই বক্তব্য ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের জটিলতা এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ভারতের দৃঢ় অবস্থানকে আবারও স্পষ্ট করে তুলল। পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদী পরিকাঠামো এবং যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনা দুই দেশের মধ্যে আলোচনার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। থারুরের নেতৃত্বে ব্রাজিল সফরে ভারতের সন্ত্রাসবিরোধী বার্তা আন্তর্জাতিক মঞ্চে পৌঁছে গেছে, যা ভারতের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে আরও শক্তিশালী করেছে। পাকিস্তানের সঙ্গে ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য তাদের সন্ত্রাসবিরোধী পদক্ষেপই হবে মূল শর্ত— এই বার্তা এখন স্পষ্ট।