“বেঁধে দেওয়া হলো রেট”-এখন ট্রেড লাইসেন্স ফি ইচ্ছামতো আদায় করা সম্পূর্ণ বন্ধ

পশ্চিমবঙ্গের শিল্পবান্ধব ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল করতে কোমর বেঁধে নেমেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশাসন। এবার সরাসরি কোপ পড়েছে পুরসভাগুলোর স্বেচ্ছাচারী ট্রেড লাইসেন্স ফি আদায়ের ওপর। রাজ্য সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এখন থেকে কোনো পুরসভা নিজেদের ইচ্ছামতো ব্যবসায়ী, দোকানদার বা শিল্পসংস্থার কাছ থেকে ট্রেড লাইসেন্স ফি নিতে পারবে না। এই মর্মে কড়া নির্দেশিকা জারি করেছে রাজ্য পুর ও নগরোন্নয়ন দপ্তর।
নির্দেশিকায় স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, রাজ্য সরকার যে ট্রেড লাইসেন্স ফি বেঁধে দেবে, তার বেশি অর্থ কোনো পুরসভা নিতে পারবে না। কোন পুরসভা কত টাকা ট্রেড লাইসেন্স ফি নিতে পারবে, তার একটি নির্দিষ্ট তালিকাও তৈরি করে দেওয়া হয়েছে।
কার জন্য কত ফি? নতুন তালিকা জারি
সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী, মিউনিসিপ্যালিটি, ইন্ডাস্ট্রিয়াল টাউনশিপ এবং নোটিফায়েড এরিয়া অথরিটিগুলো বছরে সর্বোচ্চ দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত ট্রেড লাইসেন্স ফি সংগ্রহ করতে পারবে। কলকাতা এবং হাওড়া বাদে বাকি যে সব মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন রয়েছে, তারা বছরে সর্বোচ্চ ২০০০ টাকা পর্যন্ত ট্রেড লাইসেন্স ফি নিতে পারবে। আর হাওড়া ও কলকাতা পুরসভার ক্ষেত্রে ট্রেড লাইসেন্স ফি বেঁধে দেওয়া হয়েছে বছরে ২৫০০ টাকা।
ক্ষোভের কারণ: শিল্পপতিদের দীর্ঘদিনের অভিযোগের ফল
রাজ্যের একাধিক পুরসভা ব্যবসায়ী এবং শিল্পপতিদের কাছ থেকে ইচ্ছামতো ট্রেড লাইসেন্স ফি আদায় করছে — এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কাছেও বারবার নালিশ ঠুকেছেন শিল্পপতিরা। বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের তরফেও নবান্নে স্মারকলিপি জমা দিয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছিল। শিল্প ও ব্যবসায়ী মহলের কাছ থেকে বারবার অভিযোগ আসায় অবশেষে পুর ও নগরোন্নয়ন দপ্তর ট্রেড লাইসেন্স ফি বেঁধে দেওয়ার এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিল।
ট্যাক্স আদায়ের নামে হয়রানি: মুখ্যমন্ত্রীর কড়া অবস্থান
শুধু ট্রেড লাইসেন্স ফি নয়, রাজ্যের অনেক পুরসভা, গ্রাম পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি এবং জেলা পরিষদ রোজগার বাড়াতে মানুষের কাছ থেকে অতিরিক্ত ট্যাক্স আদায় করছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। কোথাও নাগরিকদের কাছ থেকে জঞ্জাল ট্যাক্স নেওয়া হচ্ছে, কোথাও আবার ডেভেলপমেন্ট ফি-এর নামে টাকা আদায় করা হচ্ছে।
যেমন, হাওড়া গ্রামীণের উলুবেড়িয়া পুরসভার পক্ষ থেকে জঞ্জাল সংগ্রহের জন্য প্রত্যেক পরিবার পিছু মাসে ৩০ টাকা করে সার্ভিস চার্জ নেওয়া হচ্ছে। কিছুদিন আগে আলিপুরদুয়ারে প্রশাসনিক বৈঠক করতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানতে পারেন, রাজাভাতখাওয়ার জঙ্গলে ঢোকার জন্য বনদপ্তর পর্যটকদের কাছ থেকে গাড়ি পিছু ২৫০০ টাকা ‘এন্ট্রি ফি’ নিচ্ছে! এই খবর শুনে প্রশাসনিক বৈঠকে ক্ষোভ উগরে দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি নির্দেশ দেন, জঙ্গলে ঢোকার জন্য পর্যটকদের কাছ থেকে কোনো টাকা নেওয়া যাবে না।
সম্প্রতি শিলিগুড়ির দীনবন্ধু মঞ্চে উত্তরবঙ্গ শিল্প সম্মেলনে এক ব্যবসায়ী মুখ্যমন্ত্রীর কাছে সরাসরি নালিশ করেন, জিএসটি দিয়ে পণ্য কিনে নিয়ে যাওয়ার সময় রাস্তাতেই টোল ট্যাক্স দিতে হচ্ছে। পুলিশ, এমভিআই–সহ অন্যরাও বিভিন্নভাবে হয়রানি করছে, যার ফলে পণ্য পরিবহণের খরচ অনেকটাই বেড়ে যাচ্ছে। এই ‘অত্যাচার’ বন্ধ করতে তিনি মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ প্রার্থনা করেন। এই অভিযোগ পেয়েই পাশে বসা মুখ্যসচিবকে দ্রুত পদক্ষেপ করতে বলেন মুখ্যমন্ত্রী।
পরে ফুলবাড়ির হেলিপ্যাড সংলগ্ন ময়দানে সরকারি পরিষেবা প্রদান অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, শিল্পপতিদের কাছ থেকে ‘মিউটেশন ফি’র নাম করে ট্যাক্স নেওয়া হচ্ছে। রাস্তায় গাড়ি চললেও ট্যাক্স নেওয়া হচ্ছে। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, এভাবে বারবার ট্যাক্স আদায় করা যাবে না।
মুখ্যমন্ত্রীর এই কড়া নির্দেশ মেনে রাজ্যের প্রত্যেক জেলাশাসক ও বিডিওদের কাছে নতুন করে নির্দেশিকা পাঠিয়েছে রাজ্যের পঞ্চায়েত ও গ্রাম উন্নয়ন দপ্তর। তাতে বলা হয়েছে, নবান্নের অনুমতি ছাড়া পঞ্চায়েত কিংবা জেলা পরিষদ সাধারণ মানুষ বা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কোনো কর বা ফি আদায় করতে পারবে না। এর জন্য অর্থ দপ্তরের কাছ থেকে আগাম অনুমতি নিতে হবে।
এই নতুন নিয়মগুলো কি পশ্চিমবঙ্গের শিল্প ও ব্যবসার পরিবেশকে আরও সুগম করবে? নাকি এর প্রয়োগ নিয়ে নতুন কোনো জটিলতা তৈরি হবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।