“SSC-র নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, কিন্তু ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত!”-সকলের নজর সুপ্রিমকোর্টেই

৪৪,২০৩টি শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী পদে নিয়োগের যে আশ্বাস মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দিয়েছিলেন, সেই প্রেক্ষিতে শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হলো। তবে এই নিয়োগের ভবিষ্যৎ এখন সুপ্রিম কোর্টের দোরগোড়ায় ঝুলছে। শুক্রবার এসএসসি যে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে, তাতে নবম-দশম এবং একাদশ-দ্বাদশে শিক্ষক হিসেবে মাত্র ৩৫,৭২৬টি পদের উল্লেখ রয়েছে, যা মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষিত সংখ্যার চেয়ে কম।

বিজ্ঞপ্তির পরতে পরতে সুপ্রিম কোর্টের ছায়া
এসএসসি-র প্রকাশিত সাত পাতার এই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির ছত্রে ছত্রে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, এই নিয়োগের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটাই শীর্ষ আদালতের পরবর্তী নির্দেশের ওপর নির্ভরশীল। কারণ, গত ৩ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্ট ২০১৬ সালের প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীর প্যানেল বাতিল করে যে ঐতিহাসিক রায় দিয়েছিল, তার পুনর্বিবেচনা চেয়ে রাজ্য সরকার, মধ্যশিক্ষা পর্ষদ এবং এসএসসি আলাদা আলাদাভাবে রিভিউ পিটিশন দাখিল করেছে। সেই রিভিউ পিটিশনের উপর এখনও কোনো শুনানি হয়নি, এমনকি শুনানির দিনও ধার্য হয়নি।

আইনজ্ঞদের পাশাপাশি বিকাশ ভবনের কর্তাদের একটা বড় অংশের মতে, যদি সুপ্রিম কোর্ট এই পিটিশন খারিজ করে দেয় অথবা শুনানি শেষে কোনো নতুন নির্দেশ দেয়, তাহলে এই গোটা নিয়োগ প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ তারই ওপর নির্ভর করবে।

পুরোনো ও নতুন চাকরিপ্রার্থীদের দুশ্চিন্তা: কেন এই অনিশ্চয়তা?
সুপ্রিম কোর্টের রায়ে চাকরিহারা তথাকথিত ‘নন-টেন্টেড’ বা ‘যোগ্য’ চাকরিপ্রার্থীরা চাইছেন, তাদের নতুন করে পরীক্ষায় বসতে না হোক এবং সরকার তাদের পূর্ণ মেয়াদের চাকরি নিশ্চিত করুক। ফলে এই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি তাদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে, বিজ্ঞপ্তির প্রতি প্যারায় সুপ্রিম কোর্টের উল্লেখ থাকায় তাদের দুশ্চিন্তা আরও বেড়েছে। নতুন চাকরিপ্রার্থীরাও উদ্বেগে রয়েছেন যে, রিভিউ পিটিশনের রায় যাই হোক না কেন, তাতে এই বিজ্ঞপ্তি সম্পূর্ণ বা আংশিক বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

কেন পুরোনো ও নতুন, দুই অংশের চাকরিপ্রার্থীরাই এই বিজ্ঞপ্তির পরে চিন্তায়?

আইনজ্ঞদের একটা বড় অংশ বলছেন, যদি রাজ্য ও এসএসসি-র রিভিউ পিটিশন কোর্ট খারিজ করে দেয়, তাহলে বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী সবাইকেই পরীক্ষায় বসতে হবে। যেহেতু রাজ্য সরকার নিজেই এর আগে শীর্ষ আদালতে জানিয়েছিল যে, তারা রায় মেনে নতুন করে নিয়োগ করবে, তাই এই পিটিশনের যৌক্তিকতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন আইনজ্ঞদের একাংশ। তবে সে ক্ষেত্রে তথাকথিত ‘যোগ্য’ প্রার্থীদের কথা মাথায় রেখে (যদিও সরাসরি বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা উল্লেখ নেই) স্কুলে পড়ানোর পুরোনো অভিজ্ঞতা ও লেকচার ডেমোর উপর যে অতিরিক্ত ১০ নম্বর করে মোট ২০ নম্বরের একটি অংশ রাখা হয়েছে, সেটা নিয়ে কোর্ট কী অবস্থান নেয়, তা দেখার।

আইনজীবীদের একাংশের বক্তব্য, ৩ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের মূল রায় অথবা ১৭ এপ্রিল পর্ষদের মডিফিকেশন অ্যাপ্লিকেশনের উপর কোর্ট যে রায় দিয়েছে, সেখানে কোথাও লেখা নেই যে নিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন বিধি তৈরি করতে পারবে না রাজ্য। ফলে এই অতিরিক্ত নম্বরের বিধির ক্ষেত্রে সমস্যা থাকার কথা নয়। আইনজীবীদের অন্য অংশের ব্যাখ্যা হলো, যেহেতু মূল রায়ে সুপ্রিম কোর্ট বুঝিয়ে দিয়েছে ২০১৬ সালের গোটা নিয়োগ প্রক্রিয়াটাই বেআইনি, তাই ‘টেন্টেড’ বা ‘নিশ্চিতভাবে অযোগ্য’ বলে চিহ্নিতদের পাশাপাশি ‘নন-টেন্টেড’দের চাকরিও খারিজ করা হয়েছে।

নতুন বিধিতে স্পষ্টতই সুবিধা পাবেন পুরোনো ‘নন-টেন্টেড’ প্রার্থীরা। এটা হলে ২০১৬ সালে দুই ক্যাটাগরিতে শিক্ষক পদের জন্য পরীক্ষায় বসা প্রায় পৌনে তিন লক্ষ আবেদনকারীও দাবি করতে পারেন যে, তাদের এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। কারণ, একটি ত্রুটিপূর্ণ পরীক্ষা পদ্ধতির মাধ্যমে যারা শিক্ষকতার চাকরির অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন, সেটা কীভাবে ‘বৈধ’ হয়? ফলে এই বিজ্ঞপ্তি চ্যালেঞ্জ হওয়ার যথেষ্ট সুযোগ থেকে যাচ্ছে।

আবার নতুন আবেদনকারীরাও চেয়ে রয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের দিকেই। কারণ, যদি সুপ্রিম কোর্ট রিভিউ পিটিশনে সাড়া দিয়ে ‘নন-টেন্টেড’দের চাকরি বহাল রাখে, তাহলে ৩৫ হাজার শূন্যপদের মধ্যে প্রায় ১৫ হাজার এমনিতেই কমে যাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে কি নতুন পরীক্ষার্থীদের জন্য অভিজ্ঞতা বাবদ অতিরিক্ত নম্বরের সংস্থান রাখার যৌক্তিকতা আদৌ থাকে? নাকি তখন সেই বিজ্ঞপ্তিটা বদলে যাবে?

স্কুলশিক্ষা দপ্তরের এক আধিকারিকের ব্যাখ্যা, “রিভিউ পিটিশনের শুনানির উপর অনেক কিছুই নির্ভর করছে। কারণ, রিভিউ পিটিশনের মাধ্যমে পুরোনো ‘নন-টেন্টেড’রা চাকরিতে বহাল হলে তখনই শূন্যপদের সংখ্যা কমবে। না-হলে এই বিজ্ঞপ্তি খুব বদল না-হওয়ারই সম্ভাবনা। তবে ২০১৬ সালের বঞ্চিত চাকরিপ্রার্থীরা এই বিজ্ঞপ্তির ভিত্তিতে আবার কোনো মামলা দায়ের করেন কি না, সে দিকেও নজর রাখতে হবে।” তাঁর আরও যুক্তি, “এই বিজ্ঞপ্তির ছত্রে ছত্রে সুপ্রিম কোর্টে রিভিউ পিটিশনের বিষয়টি উল্লেখ করতে হয়েছে এই কারণে যে, তা না-হলে আদালত বলতে পারে আমরা সুপ্রিম-নির্দেশ পুরোপুরিই মেনে নিয়েছি। আবার রিভিউ কেন? রিভিউ–নির্দেশের উপরেই সবটা নির্ভর করছে।”

দৃষ্টি এখন শীর্ষ আদালতের দিকেই
অতএব, সব নজর সেই শীর্ষ আদালতেই। সুপ্রিম কোর্টে মূল মামলায় রায় দিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সঞ্জীব খান্না ও বিচারপতি সঞ্জয় কুমার। বিচারপতি খান্না ইতিমধ্যে অবসর নিয়েছেন। এখন কে দায়িত্ব নেবেন, নতুন ‘মাস্টার অফ রস্টার’ হিসেবে তা বর্তমান প্রধান বিচারপতি বিআর গাভাই ঠিক করবেন। তবে যেহেতু আগের বেঞ্চের বিচারপতি কুমার এখনও কর্মরত, তাই নতুন বেঞ্চেও তাকেই রাখার কথা। এই জটিল আইনি দড়ি টানাটানিতে পশ্চিমবঙ্গের লক্ষ লক্ষ চাকরিপ্রার্থীর ভবিষ্যৎ সুপ্রিম কোর্টের পরবর্তী নির্দেশের ওপরই সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল।