OBC-জট কাটিয়ে নিয়োগ হবে কোন পথে? বড় প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে স্কুল সার্ভিস কমিশন

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পর স্কুল সার্ভিস কমিশন (এসএসসি)-এর নতুন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি এখনও প্রকাশিত হয়নি। তবে মঙ্গলবার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেছেন যে, স্কুল সার্ভিস কমিশনের চারটি ক্যাটাগরিতে ৪৪ হাজার ২০৩টি পদে শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি আগামী ৩০ মে জারি হবে। এই ঘোষণা রাজ্যের শিক্ষা মহলে নতুন আশার সঞ্চার করলেও, ওবিসি সংরক্ষণ সংক্রান্ত জটিলতা নিয়োগ প্রক্রিয়াকে বড় প্রশ্নচিহ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে।
বিকাশ ভবনের কর্তারা জানিয়েছেন, রাজ্য সরকারের বর্তমান ওবিসি তালিকা কলকাতা হাইকোর্ট কর্তৃক খারিজ হয়ে গেছে। রাজ্য সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে গেছে, যেখানে মামলা বিচারাধীন রয়েছে। রাজ্য সুপ্রিম কোর্টে জানিয়েছে যে, তারা তিন মাসের মধ্যে (যার মেয়াদ জুলাই মাসে শেষ হচ্ছে) একটি নতুন ওবিসি তালিকা প্রকাশ করবে। এই পরিস্থিতিতে, ৩০ মে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি জারি হলে সেখানে ওবিসিদের জন্য কত শতাংশ সংরক্ষণ থাকবে, তা শিক্ষা দপ্তরের আধিকারিকদের কাছে এখনও স্পষ্ট নয়।
২০১৬ সালের এসএসসি-এর যে নিয়োগ প্যানেল সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করেছে, সেই সময় ওবিসিদের জন্য ১৭ শতাংশ আসন সংরক্ষিত ছিল। রাজ্য সরকার নতুন ওবিসি তালিকা চূড়ান্ত না করা পর্যন্ত এখন কত শতাংশ পদ ওবিসিদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট নির্দেশিকা নেই।
ভর্তি প্রক্রিয়াতেও জটিলতা:
এই ওবিসি সংরক্ষণ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে সরকারি স্কুল, পাঁচশোর বেশি সরকারি ও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত কলেজ এবং ৩০টি সরকার পোষিত বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে লক্ষ লক্ষ আসনে পড়ুয়া ভর্তি আটকে রয়েছে। সম্প্রতি রাজ্য জয়েন্টে ভর্তির ক্ষেত্রেও একই ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হয়েছিল, যা হাইকোর্ট পর্যন্ত গড়ায়। হাইকোর্ট তখন ২০১০ সালের আগের ৭ শতাংশ ওবিসি সংরক্ষণের ফর্মুলা মেনে আপাতত জয়েন্ট বোর্ডকে কলেজগুলিতে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তির মেধাতালিকা প্রকাশের নির্দেশ দেয়। আইনজ্ঞদের একাংশের ব্যাখ্যা, জুলাই মাস নাগাদ যদি রাজ্য সরকার সুপ্রিম কোর্টে নতুন ওবিসি তালিকা জমা দেয়, তখনও জটিলতা থেকে যাবে।
এসএসসি-এর ৪৪ হাজার ২০৩টি পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে আদৌ এই ৭ শতাংশের ফর্মুলা মানা হবে, নাকি নতুন ওবিসি তালিকা প্রকাশ পর্যন্ত অপেক্ষা করা হবে, তা নিয়ে নবান্নের কর্তারা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি।
মধ্যশিক্ষা পর্ষদের এক শীর্ষ আধিকারিক বলেছেন, “স্কুলে শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের শূন্যপদ চূড়ান্ত করার সময়ে এই ওবিসি সংরক্ষণের বিষয়টি নিয়ে আমরা কী করব, সে ব্যাপারে নবান্ন থেকে কিছু বলা হয়নি। সেটা এলেই আমরা পরবর্তী পদক্ষেপ করব।” এসএসসি-এর এক আধিকারিক জানিয়েছেন, “এখনও যা অবস্থা, তাতে শুক্রবারের মধ্যে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে গেলে আজ, বৃহস্পতিবার আমাদের হয়তো রাতভর কাজ করতে হবে। তবে তার আগে অবশ্যই ওবিসি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে কোন নীতি নেওয়া হবে, তা চূড়ান্ত করতে হবে।”
শিক্ষাব্যবস্থায় সংকট ও সরকারের যুক্তি:
আধিকারিকরা স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে ভর্তির সমস্যার কথা তুলে ধরে বলছেন যে, ওবিসি সংরক্ষণ নিয়ে এই টানাপোড়েন সরকারি ও সাহায্যপ্রাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে ভয়ঙ্কর সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। শতাব্দী প্রাচীন সরকারি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমতে কমতে তলানিতে ঠেকেছে। রাজ্যের মেধাবী ও আর্থ-সামাজিক ভাবে স্বচ্ছল পরিবারের পড়ুয়ারা ইতিমধ্যে বাংলা বা প্রতিবেশী রাজ্যের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন শাখায় ভর্তি হচ্ছেন। এখন যদি সরকারি স্কুলে শিক্ষক-শিক্ষাকর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রেও ওবিসি সংরক্ষণ নিয়ে জট তৈরি হয়, তাহলে সার্বিকভাবে গোটা রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থায় একটি গুরুতর সংকট দেখা দেবে।
রাজ্য সরকার এবং শিক্ষা দপ্তরের কর্তারা এই সমস্যার দ্রুত সমাধানের পথ খুঁজছেন, যাতে মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী ৩০ মে-এর মধ্যে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি জারি করা সম্ভব হয় এবং রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থা স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসে।