“আদালতে কেস চলবে, সেই সাথে পরীক্ষাও”-হতাশ চাকরিহারা শিক্ষকরা

সুপ্রিম কোর্টের রায় এবং ‘যোগ্য’ হিসেবে বিবেচিত চাকরিচ্যুত শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের লাগাতার আন্দোলনের মুখে অবশেষে মুখ খুললেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গত মঙ্গলবার নবান্ন থেকে এক জরুরি সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি একদিকে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশকে মান্যতা এবং অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের ক্ষোভ প্রশমনের চেষ্টা করে দুটি বিকল্প প্রস্তাব (অপশন এ ও বি) ঘোষণা করেছেন। তবে মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণায় ‘যোগ্য’ চাকরিহারা শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের একাংশ হতাশ।

মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, রাজ্য সরকার সাংবিধানিকভাবে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অমান্য করতে পারে না। এই প্রেক্ষাপটে তিনি দুটি বিকল্পের কথা উল্লেখ করেন:

অপশন এ: নতুন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ও পরীক্ষায় অংশগ্রহণ: সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে রাজ্য সরকার আগামী ৩১ মের মধ্যে নতুন করে বিজ্ঞপ্তি জারি করবে। এই বিজ্ঞপ্তিতে ‘যোগ্য’ শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদেরও বসতে হবে। তবে তাঁদের জন্য বয়সের ছাড় এবং এতদিন স্কুলে পড়ানোর অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কিছু বাড়তি নম্বর দেওয়া হতে পারে। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন, এটি সুপ্রিম কোর্টকে এই বার্তা দেওয়ার জন্য যে তাদের নির্দেশ মানা হচ্ছে।

অপশন বি: রিভিউ পিটিশনের ফলাফলের উপর নির্ভরতা: দ্বিতীয় বিকল্পটি হলো, যদি রিভিউ পিটিশনে ইতিবাচক ফল আসে (অর্থাৎ, ‘যোগ্য’ চাকরিহারাদের কোনো পরীক্ষা ছাড়াই চাকরি বহাল রাখা হয়), তবে রাজ্য সরকার তা গ্রহণ করবে।
এই ঘোষণার পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রী মোট ৪৪ হাজার ২০৩টি পদে এসএসসি-র শিক্ষক-শিক্ষাকর্মী নিয়োগের কথা ঘোষণা করেছেন। এর মধ্যে হাইকোর্ট নির্ধারিত ‘ডিমড’ (পূর্ব শূন্যপদ) ২৪ হাজার ২০৩টি শূন্যপদ এবং অতিরিক্ত ২০ হাজার পদও তৈরি করা হয়েছে।

আন্দোলনকারীদের হতাশা:

মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণায় ‘যোগ্য’ চাকরিহারা শিক্ষক-শিক্ষিকারা অবশ্য পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারেননি। সল্টলেকে আন্দোলনরত ‘যোগ্য শিক্ষক-শিক্ষিকা অধিকার মঞ্চে’র বৃন্দাবন ঘোষ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সাত বছর পরে আমাদের আবার পরীক্ষা দিতে হবে। আমরা কেউ পরীক্ষা দিতে চাইনি। মুখ্যমন্ত্রী আমাদের মৃত্যু পরোয়ানাই তো লিখে দিলেন।” তাদের মূল দাবি ছিল, পরীক্ষা ছাড়াই চাকরি বহাল রাখা।

আইনি লড়াই ও সরকারের অবস্থান:

মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, রাজ্য সরকার ইতিমধ্যেই সুপ্রিম কোর্টে রিভিউ পিটিশন জমা দিয়েছে। গরমের ছুটি শেষ হলেই আইনি প্রক্রিয়া আবার শুরু হবে। তিনি আন্দোলনকারীদের আশ্বস্ত করে বলেন, “সঠিক সময়ে সুপ্রিম কোর্টে রিভিউ পিটিশন জমা দিয়েছে রাজ্য সরকার। এখন গরমের ছুটি থাকার কারণে আদালত বন্ধ। তাই আদালত খুললে আবার আইনি প্রক্রিয়া শুরু হবে।” তিনি আরও যোগ করেন, শীর্ষ আদালতের নির্দেশ না মানলে তার ফল চাকরিহারা শিক্ষকদেরই ভুগতে হতে পারে। “সরকার কারো চাকরি কেড়ে নেওয়ার পক্ষপাতী নয়। চাকরিপ্রার্থীদের স্বার্থেই রাজ্য বিজ্ঞপ্তি জারি করতে চলেছে,” বলেন মুখ্যমন্ত্রী।

বয়স পেরিয়ে যাওয়া ‘যোগ্য’ চাকরিহারাদের জন্য বয়সের সীমায় ছাড় দেওয়া হবে এবং তাদের নতুন নিয়োগে আবেদন করার কথাও বলেছেন তিনি। এটি রিভিউ পিটিশনের নির্দেশ তাদের পক্ষে না গেলেও যাতে চাকরি পাওয়ার সুযোগ থাকে, সেই কারণেই এই বার্তা।

‘টেন্টেড’ বা ‘অযোগ্য’দের জন্য বিকল্প:

মুখ্যমন্ত্রী আরও দাবি করেছেন যে, ‘টেন্টেড’ বা ‘অযোগ্য’ বলে চিহ্নিত যাঁদের টাকা ফেরত দিতে বলা হয়েছে, চাকরি বাতিল করা হয়েছে এবং এসএসসি-র নতুন পরীক্ষায় বসতে পারবেন না, তাঁরা অন্য সরকারি দপ্তরে যোগ দিতেই পারেন (যদিও সুপ্রিম রায়ে এর উল্লেখ নেই)। তিনি শিক্ষা দপ্তরেও বিভিন্ন পদে লোকবলের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন, যেমন ঘর পরিষ্কার, ঘণ্টা বাজানো বা তালা বন্ধ করার মতো কাজ। তিনি জানিয়েছেন, অতিরিক্ত গ্রুপ সি এবং ডি পদের পাশাপাশি শিক্ষা বিভাগেও আবেদনের সুযোগ দেওয়া হবে এবং আরও তিন-চারটি বিভাগে আবেদনের সুযোগ তৈরি হবে। তবে এর জন্য আলাদাভাবে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হবে।

সব মিলিয়ে, রাজ্য সরকার একদিকে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মান্যতা দিতে বদ্ধপরিকর এবং অন্যদিকে চাকরিহারাদের ক্ষোভ প্রশমনে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার আশ্বাস দিচ্ছে। তবে ‘যোগ্য’ হিসেবে বিবেচিত চাকরিহারাদের ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। তাদের ভবিষ্যৎ অনেকটাই সুপ্রিম কোর্টের রিভিউ পিটিশনের ফলাফলের উপর নির্ভর করছে।